নিত্যপণ্যের বাজারে আটা-ময়দার দাম ঊর্ধ্বমুখী, কমেনি মুরগি-ডিমের দাম

আটা-ময়দা থেকে মুরগি-ডিম—দাম বাড়ার নেপথ্যে আসলে কী?

পাইকারিতে ৩০০ টাকা বাড়ল ময়দার বস্তায়, খুচরায় কেজিতে বাড়তি ১০ টাকা—সরবরাহ সংকটের দাবির আড়ালে কি অন্য হিসাব?

নিজস্ব অনুসন্ধান | News For Justice

নিত্যপণ্যের বাজারে আবারও অস্বস্তি। একদিকে বাড়ছে আটা ও ময়দার দাম, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে কমছে না মুরগি ও ডিমের দাম। মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। ফলে সীমিত ও মধ্যম আয়ের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যব্যয়ের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রকৃত কারণ কী? শুধু উৎপাদন ও সরবরাহ ঘাটতিই কি দায়ী, নাকি সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মূল্য সংযোজনের নামে বাড়তি মুনাফারও ভূমিকা রয়েছে?

সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে এই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

এক মাসে আটা-ময়দার দাম কতটা বাড়ল?

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে খোলা আটার দাম কেজিতে ৩ টাকা এবং খোলা ও মোড়কজাত ময়দার দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে।

কিন্তু খুচরা বাজারে ব্যবসায়ীদের হিসাবে বৃদ্ধির পরিমাণ আরও বেশি। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোলা আটা প্রায় ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যেখানে এক মাস আগে দাম ছিল প্রায় ৪৫ টাকা।

খোলা ময়দার দাম উঠেছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়; এক মাস আগে ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। প্যাকেটজাত ময়দার কেজিও ৮০ থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে প্রথম প্রশ্ন—

টিসিবির হিসাবে যেখানে দাম বৃদ্ধির পরিমাণ তুলনামূলক কম, সেখানে খুচরা বাজারে একই পণ্যের দাম আরও বেশি কেন বাড়ছে?

৫০ কেজির বস্তায় ৩০০ টাকা বেশি

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের একজন মুদিদোকানি জানিয়েছেন, আগে ৫০ কেজির এক বস্তা ময়দা প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে।

অর্থাৎ একটি বস্তায় পাইকারি পর্যায়েই প্রায় ৩০০ টাকা বৃদ্ধি

এই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পাইকারি ও ডিলার পর্যায়ে দাম বাড়ার কথা বলা হচ্ছে।

কিন্তু অনুসন্ধানের জায়গাটি এখানেই—

কার কাছ থেকে কত দামে পণ্য কেনা হচ্ছে, পরিবহন ব্যয় কত, ডিলার কমিশন কত এবং খুচরা বিক্রেতার প্রকৃত লাভ কত—এই পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের হিসাব কি নিয়মিতভাবে যাচাই করা হচ্ছে?

এই তথ্য প্রকাশ্যে না এলে ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নির্ণয় কঠিন।

মুরগি-ডিমের দামও দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায়

ব্রয়লার মুরগির দাম বর্তমানে প্রায় ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজি। দেড় মাস আগের তুলনায় দাম প্রায় ২০ টাকা বেশি। কোনো কোনো সময়ে অবশ্য এই মুরগি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা কেজিতেও বিক্রি হয়েছে।

বাদামি ফার্মের ডিমের এক ডজন প্রায় ১৫০ টাকা এবং সাদা ডিম প্রায় ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রায় দেড় মাস ধরে ডিমের দামে বড় পরিবর্তন নেই।

ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যা—বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমের কারণে অনেক খামারে উৎপাদন কমেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম কমছে না।

এই ব্যাখ্যা বাজারের বাস্তবতার একটি সম্ভাব্য কারণ। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন রয়েছে—

খামার পর্যায়ে প্রকৃত উৎপাদন কতটা কমেছে?

দেশে মোট ডিম ও ব্রয়লার উৎপাদনের পরিমাণ কত?

খামার থেকে পাইকার, পাইকার থেকে আড়ত এবং আড়ত থেকে খুচরা বাজার—প্রতিটি স্তরে দাম কত করে বাড়ছে?

এসব তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হলে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।

উৎপাদন কমলে দাম বাড়ে, কিন্তু উৎপাদন বাড়লে দাম কমে কতটা?

এটি নিত্যপণ্যের বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

উৎপাদন কমলে ব্যবসায়ীরা সরবরাহ ঘাটতির কথা বলেন এবং দাম বাড়ে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লে সেই অনুপাতে বাজারদর দ্রুত কমছে কি না—তা নিয়েও ভোক্তাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে দাম একটি নির্দিষ্ট উচ্চ পর্যায়ে স্থির থাকলে বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থা, মজুত, পাইকারি মূল্য এবং খুচরা মার্জিন আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

শুধু মুরগি-ডিম নয়, মাছের বাজারেও চাপ

রুই মাছের দাম বর্তমানে প্রায় ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা এবং কাতলা ৪২০ থেকে ৪৪০ টাকা কেজি। পাঙাশ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা এবং পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

অর্থাৎ একটি পরিবারের দৈনন্দিন খাবারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উৎস—আটা, ময়দা, ডিম, মুরগি ও মাছ—সবগুলোতেই ভোক্তাকে তুলনামূলক বেশি দাম দিতে হচ্ছে।

বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর উদ্যোগও প্রশ্ন তুলেছে

আটা-ময়দাসহ কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে সম্প্রতি বানরুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

পরে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যয় যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং রুটি-বিস্কুটের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখা হয়।

এখানেও একই প্রশ্ন—

একটি পণ্যের দাম বাড়ানোর আগে তার উৎপাদন ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব কি প্রকাশ করা উচিত নয়?

ভোক্তা কোথায় যাবে?

বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ ভোক্তার সামনে বিকল্প খুব কম থাকে। প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই হয়।

ফলে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে পরিবারের মাসিক বাজেটের ওপর।

বিশেষ করে আটা-ময়দার দাম বাড়লে শুধু ঘরের খাবার নয়, রুটি, বিস্কুট, বেকারি ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

News For Justice-এর অনুসন্ধানী প্রশ্ন

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে—

১. আটা-ময়দার পাইকারি ও খুচরা দামের পার্থ্য কত?

২. ৫০ কেজি ময়দার বস্তার দাম কেন এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৩০০ টাকা বাড়ল?

৩. উৎপাদন কমার যে দাবি করা হচ্ছে, তার পরিসংখ্যান কোথায়?

৪. খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত ডিম ও মুরগির প্রতিটি স্তরে কত টাকা করে মূল্য বাড়ছে?

৫. কোনো পর্যায়ে অস্বাভাবিক মুনাফা বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, তা কি যাচাই করা হচ্ছে?

৬. বাজার মনিটরিংয়ের সময় শুধু খুচরা বিক্রেতাকে নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে কি নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে?

করণীয় কী?

বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুধু খুচরা বাজারে অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন খামার/উৎপাদক → ডিলার → পাইকার → আড়ত → খুচরা বিক্রেতা → ভোক্তা—পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার মূল্যতথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা।

একই সঙ্গে উৎপাদন, আমদানি, মজুত, পরিবহন ব্যয় ও খুচরা পর্যায়ের লাভের তথ্য বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

কারণ, দাম বাড়ার কারণ যদি সত্যিই উৎপাদন ও সরবরাহ সংকট হয়, তাহলে তার তথ্য-প্রমাণ থাকা উচিত। আর যদি সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো স্তরে অস্বাভাবিক মূল্য সংযোজন ঘটে, সেটিও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

নিত্যপণ্যের বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই পারে ভোক্তার আস্থা ফিরিয়ে আনতে।

News For Justice-এর অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ