তোফাজ্জল হত্যার দুই বছর—বিচার শুরু হয়নি, ১৭ আসামি এখনো পলাতক

বিশেষ অনুসন্ধান

তোফাজ্জল হত্যার দুই বছর—বিচার শুরু হয়নি, ১৭ আসামি এখনো পলাতক

হলের ভেতর নির্মম মৃত্যু, অভিযোগপত্রে ২৮ আসামি—তারপরও বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

বিশেষ প্রতিবেদন | News For Justice

দুই বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে ঘটে যাওয়া তোফাজ্জল হোসেন হত্যাকাণ্ড এখনো বিচার শুরুর অপেক্ষায়। বহুল আলোচিত ওই ঘটনায় তদন্ত শেষে ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা—পিবিআই। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন।

কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার মূল বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।

অভিযোগপত্রভুক্ত ২৮ আসামির মধ্যে বর্তমানে দুজন কারাগারে, নয়জন জামিনে এবং ১৭ জন এখনো পলাতক বলে মামলার সর্বশেষ তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি সামনে এনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডে তদন্ত শেষ হয়ে অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়ার পরও কেন দুই বছরেও বিচার শুরু হলো না?


যেভাবে শুরু, সেভাবেই শেষ হয়েছিল একটি জীবন

২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করার সময় তোফাজ্জল হোসেনকে কয়েকজন শিক্ষার্থী ধরে হলের অতিথিকক্ষে নিয়ে যান বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ তোলা হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, সেখানে তাকে মারধর ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তার পরিচয় জানার পর তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ—এমনটি বুঝতে পেরে তাকে হলের ক্যান্টিনে নিয়ে খাবার খাওয়ানো হয়।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, খাবার খাওয়ানোর পরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি।

তাকে আবার অতিথিকক্ষে নিয়ে জানালার সঙ্গে হাত বেঁধে স্ট্যাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয় বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।

ঘটনার ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।


খাবার খাওয়ানোর পরও কেন থামেনি নির্যাতন?

এই মামলার সবচেয়ে মর্মান্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি এখানেই।

অভিযোগপত্র ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তোফাজ্জলকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে বুঝতে পারার পর তাকে খাবার দেওয়া হয়েছিল।

অর্থাৎ তখন তার অসহায় অবস্থার বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের কাছে স্পষ্ট হওয়ার কথা।

তারপরও যদি অভিযোগ অনুযায়ী নির্যাতন অব্যাহত থেকে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—

কে বা কারা নির্যাতন চালিয়েছিল?

কতক্ষণ ধরে নির্যাতন চলেছিল?

ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যরা কী ভূমিকা পালন করেছিলেন?

তোফাজ্জলকে উদ্ধারের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া জরুরি।


স্বজনের ফোনও কি থামাতে পারেনি নির্যাতন?

মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, তোফাজ্জলকে আটকে মারধর করার খবর পেয়ে তার মামাতো বোন আসমা আক্তার তানিয়া একজন শিক্ষার্থীর নম্বরে ফোন করে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।

তিনি তোফাজ্জল মানসিকভাবে অসুস্থ—এ কথাও জানিয়েছিলেন বলে তার বক্তব্যে এসেছে।

কিন্তু তার অভিযোগ, অনুরোধের পরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি; বরং আরও বেড়েছিল।

এই অভিযোগ সত্য হলে সেটি মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কারণ, স্বজনের পক্ষ থেকে তার অসুস্থতার কথা জানানোর পরও যদি নির্যাতন অব্যাহত থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য, ভূমিকা, উপস্থিতি এবং দায় আদালতের সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


তদন্তে ২৮ আসামি, কিন্তু বিচার কোথায়?

প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করে একটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করলে আদালত পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন।

পরবর্তীতে পিবিআই নতুন করে তদন্ত করে আরও সাতজনসহ মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়।

গত ১০ মার্চ আদালত সেই অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

তারপরও বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ—শুরু হয়নি।

এখানেই মামলার দীর্ঘসূত্রতার প্রশ্নটি সামনে আসে।


১৭ আসামি পলাতক—দায় কার?

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্ত শেষে ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং পলাতকদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ার পর পলাতকদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট থানার।

অন্যদিকে প্রসিকিউশন পক্ষ বলছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদন না আসায় মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এগোয়নি।

ফলে এখানে একটি প্রশাসনিক প্রশ্নও তৈরি হচ্ছে—

পলাতক ১৭ আসামির প্রত্যেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তাদের অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

তাদের কেউ দেশত্যাগ করেছে কি না, আত্মগোপনে আছে কি না কিংবা নিয়মিত কোনো পরিচিত স্থানে অবস্থান করছে কি না—এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমের অগ্রগতি কী?

এসব তথ্য জনসমক্ষে এলে মামলার অগ্রগতির বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।


দুই বছরেও বিচার শুরু না হওয়ার কারণ কী?

মামলার বাদীপক্ষের বক্তব্য—দুই বছর হয়ে গেলেও বিচার শুরু হয়নি এবং তারা দ্রুত বিচার চান।

অন্যদিকে প্রসিকিউশন জানিয়েছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হবে এবং সেখানে অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে।

অর্থাৎ মামলার অগ্রগতিতে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কয়েকটি ধাপ:

পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার → গ্রেপ্তারসংক্রান্ত প্রতিবেদন → মামলার পরবর্তী আদালতীয় কার্যক্রম → অভিযোগ গঠন → সাক্ষ্যগ্রহণ → বিচার।

প্রশ্ন হলো, এই ধাপগুলো সম্পন্ন করতে আরও কত সময় লাগবে?


তোফাজ্জল কে ছিলেন?

তোফাজ্জল হোসেনের জীবনের গল্পটিও এই ঘটনার মানবিক দিকটি বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ।

তার বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নে। তিনি বরিশাল বিএম কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছিলেন বলে স্বজনদের বক্তব্যে জানা যায়।

পারিবারিকভাবে একের পর এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার পর তার মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে বলে পরিবার জানিয়েছে।

প্রথমে তার বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। পরে মা মারা যান। এরপর তার বড় ভাই—যিনি পুলিশে এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তাকে দেখাশোনা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন—তিনিও ক্যান্সারে মারা যান।

এরপর তোফাজ্জল কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তার অসুস্থতার কারণে নিয়মিতভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসার আওতায় রাখা সম্ভব হয়নি।


একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যা মামলার প্রশ্ন নয়।

এটি সমাজে মানসিকভাবে অসুস্থ, অসহায় ও অভিভাবকহীন মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।

একজন ব্যক্তি যদি সত্যিই মানসিকভাবে অসুস্থ হন এবং অপরাধের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি দেওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি?

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতা নয়; বরং আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি গুরুতর চ্যালেঞ্জ।


এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ প্রশ্ন

১. দুই বছর পরও কেন এই মামলার অভিযোগ গঠন শুরু হয়নি?

২. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরও ১৭ আসামি কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক থাকছেন?

৩. পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

৪. ঘটনার সময় উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা তদন্তে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে?

৫. একজন মানসিকভাবে অসুস্থ ও অসহায় মানুষকে চোর সন্দেহে আটক করার পর তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে কেন পরিস্থিতি প্রাণঘাতী পর্যায়ে গেল—এর পূর্ণাঙ্গ জবাব কি বিচারিক প্রক্রিয়ায় পাওয়া যাবে?


পরিবারের অপেক্ষা—ন্যায়বিচারের

তোফাজ্জলের মামাতো বোন আসমা আক্তার তানিয়া বলেছেন, দুই বছর হয়ে গেলেও বিচার শুরু না হওয়ায় তাদের ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। তারা বিচার চান।

মামলার বাদীও প্রকৃত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান বলে জানিয়েছেন।

তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো আসামিকে আইনগতভাবে দোষী বলা যায় না। তাই এই মামলায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

একটি মানুষের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেই ক্ষোভ হয়তো অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে। কিন্তু পরিবারের কাছে সেই রাত এখনো শেষ হয়নি।

দুই বছর পর প্রশ্ন একটাই—তোফাজ্জলের মৃত্যুর বিচার কবে শুরু হবে?

News For Justice-এর বিশেষ অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ