
সার্কিট হাউস থেকে গণকবর: যেভাবে সরিয়ে নেওয়া হয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ
নিউজ ফর জাস্টিস ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১:০৫ মিনিট
৪৫ বছর আগে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তার মরদেহ কয়েক ঘণ্টার জন্য কোথায় নেওয়া হয়েছিল—এ প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয় ছিল।
ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, কমিশনের প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। সম্প্রতি একটি মুদ্রিত কপি প্রকাশ্যে আসার পর জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ সরিয়ে নেওয়া, অজ্ঞাত স্থানে দাফন এবং পরবর্তীতে উদ্ধার পর্যন্ত পুরো ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ।
ময়নাতদন্তে যা উঠে আসে
তদন্ত প্রতিবেদনে সংযুক্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শরীরে পৃথক ২০টি গুলির ক্ষত পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তার মুখে একাধিক গুলি লাগে। নিচের চোয়ালের হাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং ঘাড়ের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধারণা করা হয়, খুব কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো হয়েছিল। এছাড়া বুক ও পেটে প্রায় ১০টি, ডান হাতে দুটি, নাভির নিচে একটি এবং দুই পায়ে একাধিক গুলির ক্ষত ছিল।
সার্কিট হাউসে মরদেহ
৩০ মে সকালে রাষ্ট্রপতির মরদেহ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের ৪ নম্বর কক্ষের সামনে পড়ে ছিল। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চলে যাওয়ার পর সেখানে শুধু জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) দুই কর্মকর্তা পাহারায় ছিলেন।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা চরম উদ্বেগ ও বিভ্রান্তির মধ্যে ছিলেন। স্থানীয় সেনাবাহিনীর একটি অংশ বিদ্রোহ করেছে—এমন পরিস্থিতিতে তারা মরদেহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।
সেনাবাহিনীর আগমন ও মরদেহ সরিয়ে নেওয়া
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দুটি সামরিক জিপ ও একটি অস্ত্রসজ্জিত সেনা ভ্যান সার্কিট হাউসে আসে। তিনজন মেজর ও ১০–১৫ জন সেনাসদস্য এনএসআই কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রাষ্ট্রপতির কক্ষে তল্লাশি চালান।
রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি স্যুটকেসে রাখা হয়। পরে সাদা চাদরে মরদেহ ঢেকে ও মুড়িয়ে ভ্যানে তোলা হয়। একই সঙ্গে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঈনুল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহও একই ভ্যানে তোলা হয়।
প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তিনটি মরদেহ অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
কোথায় ছিল মরদেহ?
জিয়াউর রহমানের মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসনের কাছে কোনো তথ্য ছিল না যে সেটি কোথায় নেওয়া হয়েছে বা কোথায় দাফন করা হয়েছে।
১ জুন বিদ্রোহ দমনের পর সেনাবাহিনী মরদেহের সন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে জানা যায়, কাপ্তাই সড়কের পাশে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পাথরঘাটা গ্রামের একটি পাহাড়ের ঢালে একটি কবর রয়েছে।
সেখানে জিয়াউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঈনুল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহ দাফন করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরে মরদেহগুলো উত্তোলন করে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ
কমিশনের মতে, হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষার বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
সে সময় চট্টগ্রাম কার্যত বিদ্রোহী সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। যোগাযোগব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সেনাবাহিনীর একটি অংশের দখলে থাকায় স্থানীয় কর্মকর্তাদের পক্ষে মরদেহ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া বাস্তবসম্মত ছিল না।
কমিশন আরও উল্লেখ করে, ঢাকার মন্ত্রিসভাও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। স্থানীয় কর্মকর্তাদের নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করা হলেও, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কমিশন তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নেয়।
এছাড়া কমিশন মন্তব্য করে, সার্কিট হাউসে উপস্থিত দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কেউই রাষ্ট্রপতির মরদেহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে কার্যকর নির্দেশনা দেননি।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে মূল্যায়ন
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৩০ মে থেকে ১ জুন ভোর পর্যন্ত চট্টগ্রাম কার্যত অবরুদ্ধ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় কর্মকর্তারা ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ’ নীতি গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের এ সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক বলা যায় না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখতে না পারার জন্য পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো সদস্যকে দায়ী করার মতো প্রমাণ কমিশন পায়নি।
শেষ যাত্রা
ময়নাতদন্ত শেষে বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন উড়োজাহাজে জিয়াউর রহমানের মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। প্রথমে রাষ্ট্রপতি ভবন এবং পরে জাতীয় সংসদ ভবনে নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১৯৮১ সালের ২ জুন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানে (তৎকালীন ক্রিসেন্ট লেকের পাশে) তাকে দাফন করা হয়।
দাফনের সময় তিন বাহিনীর কন্টিনজেন্ট রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করে। সেনাবাহিনীর বিউগলবাদকেরা ‘লাস্ট পোস্ট’ বাজান, তিন বাহিনীর প্রধানরা স্যালুট জানান এবং উপস্থিত বিপুল জনতা অশ্রুসিক্ত নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

