বাবা, আমাকে উদ্ধার করো’—তাজমিনের শেষ বার্তার পর যা ঘটেছিল

ধর্ষণের চেষ্টা প্রতিরোধের অভিযোগ, পরে হত্যার দাবি পুলিশের | গ্রেপ্তার সিএনজিচালক

নিজস্ব প্রতিবেদক | News For Justice

কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া (৩৫) তাজমিনকে নির্জন এলাকায় নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। তাজমিন প্রতিরোধ করলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়।

ঘটনার পর চট্টগ্রামে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন সুমন। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও লালমাই থানা পুলিশের যৌথ দল।

শেষ মুহূর্তে বাবাকে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল তাজমিন

পুলিশ ও পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। পরে বুধবার রাত ১২টা ১৯ মিনিটের দিকে তাকে কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা যায়।

এরপর রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে উদ্ধার করার অনুরোধ করে তাজমিন। তবে গভীর রাতে বাবা ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারেননি।

পরদিন সকালে মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে পরিবার জানতে পারে, সেই রাতেই তাকে লালমাইয়ের একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

অটোরিকশার সূত্র ধরে তদন্ত

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিন নগরীর রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার জন্য সুমনের অটোরিকশা ভাড়া করেন। কিন্তু নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে চালক তাকে অন্যদিকে নিয়ে যান।

একপর্যায়ে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি নির্জন সড়কের পাশে অটোরিকশাটি যায়। সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হলে তিনি প্রতিরোধ করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে অটোরিকশাটি সড়কের পাশে ধানখেতে কাত হয়ে পড়ে যায়। এরপর তাজমিনকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পালানোর আগে নিয়ে যায় আইফোন

পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে নেন সুমন। পরে মোবাইলটি ধানখেতে লুকিয়ে রেখে অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলে ফেলে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যান তিনি।

ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি এলাকা থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাগমারা এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে আইফোন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অটোরিকশা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ধানখেত থেকে উদ্ধার হয়েছিল তাজমিনের মরদেহ

৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর এলাকার একটি ধানখেতের আইলের পাশে তাজমিনের মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি তাজমিনের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তার বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

লালমাই থানার পুলিশ ও ডিবি যৌথভাবে তদন্ত চালিয়ে সুমনকে গ্রেপ্তার করে।

আদালতে সোপর্দ

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানিয়েছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন। তাকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলছে।

তবে আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন কি না, তা আদালতে উপস্থাপনের পরই জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তাজমিন ছিল কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা আব্দুল আলিম রেনেটা পিএলসির কুমিল্লা অঞ্চলে কর্মরত। পরিবারের সঙ্গে তারা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।

News For Justice-এর পক্ষ থেকে—তাজমিন হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির আইনানুগ জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ ও আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করার আহ্বান জানাচ্ছি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ