গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ তিন দিনে ছড়িয়ে পড়ল পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন

মিরপুরে সংঘর্ষ ও মামলা, সাভার-আশুলিয়া পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জে অবরোধ; আজও উত্তপ্ত শিল্পাঞ্চল

নিউজ ফর জাস্টিস ডেস্ক | ঢাকা | ৩ নভেম্বর ২০২৬

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন গত তিন দিনে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুরুতে গাজীপুর ও মিরপুরে সীমাবদ্ধ থাকা বিক্ষোভ ক্রমে সাভার-আশুলিয়া হয়ে নারায়ণগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। আজ মঙ্গলবারও গাজীপুর, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে।

প্রথম দিন: গাজীপুরে শুরু উত্তেজনা

আন্দোলনের শুরুতে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধিসহ দাবিতে রাস্তায় নামেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়। সোমবারও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল এবং একটি কাভার্ডভ্যানে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়।

একই সময়ে মিরপুরেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ

গাজীপুরের পাশাপাশি রাজধানীর মিরপুরেও শুরু হয় পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন। মিরপুর-১০, ১১, ১২ ও ১৪ এলাকায় শ্রমিকদের অবস্থান ও বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থান নেয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ব্যবহার করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর, পুলিশের ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে মিরপুর ও পল্লবী থানায় একাধিক মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

দ্বিতীয় দিন: গাজীপুর-মিরপুরের বাইরে সাভার-আশুলিয়া

সোমবার আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ে। সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিকরা বিক্ষোভে নামেন। কোথাও সড়কে অবস্থান, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং কোথাও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাবে শত শত পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ৬৭৯টি পোশাক কারখানার শ্রমিক কাজে না গিয়ে বেরিয়ে যান বলে প্রথম আলো জানিয়েছে।

এরপর যুক্ত হলো নারায়ণগঞ্জ

গত সোমবার নতুন করে আন্দোলনে যুক্ত হয় নারায়ণগঞ্জ। ফতুল্লা ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড এলাকায় পোশাকশ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

সোমবার বিকেলে শ্রমিকরা সড়ক ছেড়ে দিলেও মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

তৃতীয় দিন: আজও থামেনি আন্দোলন

মঙ্গলবার সকালেও গাজীপুরের নাওজোর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকরা। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের দাবি—বকেয়া ও ন্যূনতম বেতন-ভাতা বৃদ্ধি।

অন্যদিকে মিরপুরে আজও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান দেখা গেছে। আন্দোলন ঘিরে এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতির খবরও পাওয়া গেছে।

নারায়ণগঞ্জেও মঙ্গলবার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও অবরোধের খবর পাওয়া গেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

৬৭০-এর বেশি কারখানায় প্রভাব

আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাকশিল্পে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সোমবার ও মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৬৭০ থেকে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত বা বন্ধ থাকার তথ্য এসেছে। বিজিএমইএর তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম আলো জানিয়েছে, ৩ নভেম্বর ৬৭৯টি কারখানার শ্রমিক কাজে না গিয়ে বেরিয়ে যান।

শ্রমিকদের দাবি বনাম নাশকতার অভিযোগ

শ্রমিকদের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং মজুরি-ভাতা বৃদ্ধির দাবি। অন্যদিকে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে নাশকতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।

ফলে পরিস্থিতি এখন দুটি সমান্তরাল প্রশ্ন সামনে এনেছে—শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার বাস্তব সংকটের সমাধান কীভাবে হবে এবং সেই আন্দোলনের মধ্যে সহিংসতা বা নাশকতার ঘটনা কীভাবে ঠেকানো হবে।

গাজীপুর থেকে মিরপুর, এরপর সাভার-আশুলিয়া হয়ে নারায়ণগঞ্জ—তিন দিনের ঘটনাপ্রবাহে আন্দোলনের ভৌগোলিক বিস্তারই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে উৎপাদন, পরিবহন ও জনজীবন স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখন প্রশ্ন—আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান আসবে, নাকি দেশের আরও শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে শ্রমিক অসন্তোষ?

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ