তাজমিন হত্যা: সিএনজি চালক গ্রেপ্তার, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য

News For Justice | কুমিল্লা

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় সিএনজিচালক সুমন মিয়াকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া এসব তথ্য জানান।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী যেভাবে ঘটনা ঘটে

পুলিশ জানায়, বুধবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার জন্য সুমনের সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। অভিযোগ রয়েছে, পদুয়ার বাজার এলাকা থেকে চালক নির্ধারিত গন্তব্যের পরিবর্তে তাকে বিভিন্ন সড়ক ঘুরিয়ে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান।

সেখানে তাজমিনকে জোরপূর্বক যৌন নির্যাতনের চেষ্টা করা হলে সে প্রতিরোধ করে বলে পুলিশের ভাষ্য। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির মধ্যে অটোরিকশাটি সড়কের পাশের ধানখেতে কাত হয়ে পড়ে যায়।

পুলিশের দাবি, পরবর্তীতে সুমন তাজমিনকে হত্যা করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। এরপর নিহতের সঙ্গে থাকা একটি আইফোন নিয়ে সেটি একটি ধানখেতে লুকিয়ে রাখেন এবং অটোরিকশা ফেলে চট্টগ্রামের দিকে চলে যান।

অটোরিকশার সূত্র ধরে তদন্ত

ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন নম্বরের সূত্র ধরে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডিবি ও লালমাই থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি এলাকা থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাগমারা এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে নিহতের আইফোন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অটোরিকশা উদ্ধার করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন। তাকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলছে।

তবে আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি।

কীভাবে উদ্ধার হয় তাজমিনের মরদেহ

পুলিশ জানায়, গত ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর এলাকার একটি ধানখেতের আইলের পাশে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি জান্নাতুল তাজমিনের বলে শনাক্ত করেন।

তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত সে।

বাবার মোবাইলে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন

পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল তাজমিন।

পরে বুধবার রাত ১২টা ১৯ মিনিটের দিকে তাকে কুমিল্লার একটি হোটেলের সামনে শেষবারের মতো দেখা যায়। রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমিন তার বাবার WhatsApp-এ নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে উদ্ধারের অনুরোধ করে একটি বার্তা পাঠিয়েছিল বলে পরিবার জানিয়েছে।

তবে গভীর রাতে বাবা ঘুমিয়ে থাকায় ওই বার্তাটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারেননি। পরদিন মরদেহ উদ্ধারের পর বিষয়টি পরিবারের কাছে স্পষ্ট হয়।

এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

তদন্ত ও বিচার নিয়ে প্রত্যাশা

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সুমনের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং তাকে আদালতে উপস্থাপন করা হবে।

অপ্রাপ্তবয়স্ক তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, জড়িতদের আইনের আওতায় আনা এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

News For Justice-এর পক্ষ থেকে প্রশ্ন—একজন কিশোরী কীভাবে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে এমন ভয়াবহ ঘটনার শিকার হলো, এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে গণপরিবহন ও যাত্রী নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

নোট: প্রতিবেদনে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ