
News For Justice-এর নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পিএলসিকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও গ্রাহকবান্ধব ব্যাংক হিসেবে গড়ে তুলতে আর্থিক শৃঙ্খলা, ঋণ আদায়, সুশাসন, ডিজিটালাইজেশন ও গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মো. মজিবর রহমান।
অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত নিয়ে News For Justice-এর নিজস্ব প্রতিনিধি সম্প্রতি জনতা ব্যাংকের এমডি ও সিইও মো. মজিবর রহমানের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকারে তিনি জনতা ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণ, ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ, রেমিট্যান্স, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল ব্যাংকিং, গ্রাহকসেবা এবং দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
মো. মজিবর রহমান বলেন, জনতা ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক। এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নেওয়া শুধু একটি ব্যাংক পরিচালনার বিষয় নয়; দেশের অর্থনীতি, শিল্প-বাণিজ্য, কৃষি, রেমিট্যান্স ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার দায়িত্বও এর সঙ্গে জড়িত।
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক শৃঙ্খলা, ঋণ আদায় এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, বড় ঋণের ঝুঁকি এবং অতীতের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা। তবে এসব সমস্যাকে সংস্কারের সুযোগ হিসেবেই দেখছেন তিনি।
খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর অবস্থান
জনতা ব্যাংকের ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত হিসাবে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা উল্লেখ করে এমডি বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় এখন ব্যাংকের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

এ জন্য তিন স্তরে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। সাময়িক সমস্যায় থাকা কিন্তু সক্ষম ঋণগ্রহীতাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী পুনর্গঠন বা পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হবে। অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার পরিশোধ সক্ষমতা, ক্যাশ ফ্লো, জামানত এবং খাতভিত্তিক ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মো. মজিবর রহমান বলেন, “ভালো ঋণগ্রহীতাকে সহায়তা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান”— এই নীতিতেই ব্যাংক এগিয়ে যাবে।
ব্যাংকের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ
ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ গ্রাহকের আস্থা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, কমপ্লায়েন্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
বড় ঋণের অনুমোদন, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন, জামানত মূল্যায়ন এবং ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কোনো কর্মকর্তা বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে অনিয়ম ধরা পড়লে তা গোপন না করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান জনতা ব্যাংকের এমডি।
রেমিট্যান্সে আরও দ্রুত ও নিরাপদ সেবা
প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে দ্রুত, সহজ ও নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মো. মজিবর রহমান।
তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা রয়েছে। ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে এক্সচেঞ্জ হাউজ ও করেসপন্ডেন্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আহরণ করা হচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রেরিত রেমিট্যান্স দ্রুততম সময়ে সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার চেষ্টা
_
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বও বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিস্টেম মনিটরিং, এক্সেস কন্ট্রোল, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, ডাটা ব্যাকআপ ও রিকভারি এবং ইনসিডেন্ট রেসপন্সসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
তিনি জানান, জনতা ব্যাংকের কার্ড ব্যবসা পরিচালনায় গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি টিম টানা দ্বিতীয়বারের মতো আন্তর্জাতিক PCI-DSS Compliance Certificate অর্জন করেছে।
৯২৯ শাখায় সেবা, বাড়ছে ডিজিটাল ব্যাংকিং
গ্রাহকসেবা আধুনিকায়নে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সেবা, কার্ড, কিউআর পেমেন্ট, ডিজিটাল ফান্ড ট্রান্সফার এবং স্বয়ংক্রিয় গ্রাহকসেবা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মো. মজিবর রহমান জানান, বর্তমানে জনতা ব্যাংকের দেশে ৯২৫টি এবং বিদেশে ৪টি শাখাসহ মোট ৯২৯টি শাখা রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় ব্যাংকের প্রথম উপশাখা চালু করা হয়।
২০২৬ সালে জনতা ব্যাংক ভিসা ডুয়েল কারেন্সি ডেবিট কার্ড চালু করেছে বলেও জানান তিনি। এর মাধ্যমে দেশ ও বিদেশে অনলাইন লেনদেনের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হয়েছে।
বাংলা কিউআরের মাধ্যমে আন্তঃলেনদেনযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি ই-জনতা (e-Janata) প্ল্যাটফর্মে কিউআর কোডের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে আর্থিক সেবা দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানান।
কৃষি ও এসএমই খাতে অর্থায়নে গুরুত্ব
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি, এসএমই, সিএসএমই, রপ্তানিমুখী শিল্প, সবুজ অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে উৎপাদনশীল ঋণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সহায়তায় কৃষি ঋণ, এসএমই খাতের উন্নয়ন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
দেশের অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদী জনতা ব্যাংকের এমডি
বর্তমান অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের ধীরগতি, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন মো. মজিবর রহমান।
তবে রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থার উন্নতি, রপ্তানি, কৃষি এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনাকে অর্থনীতির ইতিবাচক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তার মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, ঋণ বিতরণ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবের ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে জনতা ব্যাংকের এমডি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনতা ব্যাংক সরকারের উন্নয়নমূলক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের আর্থিক শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যতের অন্যতম লক্ষ্য।
“জনতার ব্যাংক হিসেবে জনতার আস্থা পুনর্গঠন এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখাই আমাদের লক্ষ্য,” বলেন মো. মজিবর রহমান।

