
আগস্টে সহি
৫৩ মব সহিংসতায় নিহত ২৮, আহত ৬২ | রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত ৫৩৬ | নির্যাতনের শিকার ৪৫ সাংবাদিক
নিজস্ব প্রতিবেদক | News for Justice
দেশে মানবাধিকার ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে সারাদেশে ৫৩টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ২৮ জন নিহত এবং ৬২ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্তত ৭০টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জনের বেশি।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) মাসিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং সংগঠনটির নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ১৬৪ জন আহত হয়েছিলেন। আগস্টে সেই সংখ্যা বেড়ে ৭০টি ঘটনায় দাঁড়িয়েছে। নিহতের সংখ্যা হয়েছে ৭ এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জনের বেশি।
আগস্টে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে ২০টি ঘটনায় ৫ জন নিহত ও অন্তত ১৫২ জন আহত হয়েছেন।
বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ১৮টি ঘটনায় একজন নিহত ও ২৩৩ জন আহত হন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের ৭টি ঘটনায় একজন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষের ৬টি ঘটনায় ১৬ জন এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষের ১০টি ঘটনায় ৩৮ জন আহত হয়েছেন।
ক্যাম্পাসেও সংঘাত
আগস্টে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘর্ষের অন্তত ১৩টি ঘটনায় ২১৬ জন আহত হয়েছেন।
এর মধ্যে ছাত্রদল ও শিবিরের সংঘর্ষের ৮টি ঘটনায় ১৮১ জন এবং ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ৫টি ঘটনায় ৩৫ জন আহত হন।
এইচআরএসএস বলছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা, দলীয় ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৯টি ঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আগস্টে কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন।
৬২টির বেশি রাজনৈতিক মামলা
আগস্টে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ৬২টির বেশি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস।
এসব মামলায় ১ হাজার ১২৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০৯ জনকে।
একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ১৬২টি ঘটনায় ১২ হাজার ৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপরও হামলা
আগস্টে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির অন্তত ৩২টি ঘটনায় ৪৫ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তাদের মধ্যে ২৬ জন আহত, ৬ জন লাঞ্ছিত এবং ৭ জন হুমকির শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।
সংবাদ প্রকাশের জেরে করা একটি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর আওতায় করা আরেকটি মামলায়ও একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
আগস্টে ২৪৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। তাদের মধ্যে অন্তত ৭৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকারদের ৪৬ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী।
এ ছাড়া ১৮ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৯৩ জন, যাদের মধ্যে ৩৮ জন শিশু।
একই মাসে ২৮২ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ২০৫ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
কর্মক্ষেত্রেও প্রাণহানি
আগস্টে অন্তত ৮৪টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং কমপক্ষে ৬৭ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
সীমান্তে নিহত ৩
আগস্টে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৮টি ঘটনায় বিএসএফের হামলায় ২ জন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন বাংলাদেশি যুবক নিহত এবং একজন আহত হয়েছেন।
বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার ৮৭ লাশ
আগস্টে দেশের বিভিন্ন নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৮২টি ঘটনায় ৮৭টি লাশ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস।
উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর মধ্যে ১২টি বস্তাবন্দী, ১৭টি ঝুলন্ত এবং ২৬টি শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নসহ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৯টি গলাকাটা এবং ৮টি হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধারের তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।
একই সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ৬ জন আসামির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন কয়েদি ও ৫ জন হাজতি ছিলেন।
‘পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক’
সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, আগস্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে সরকারকে জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
News for Justice — সত্য, ন্যায় ও জনস্বার্থের পক্ষে।

