দাম বেড়েছে সবকিছুর, চাপে সীমিত আয়ের মানুষ

‘কী খাব’ থেকে এখন ভাবনা—‘কী বাদ দিলে মাসটা চালানো যাবে’

News for Justice | বিশেষ প্রতিবেদন

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবার ব্যয় বাড়ায় চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। আয় একই থাকলেও প্রতিদিনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে খাবার ও প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে। মাছ-মাংসের বদলে ডিম, ব্র্যান্ডের পণ্যের বদলে কমদামি বিকল্প—এভাবেই ব্যয় সামলানোর চেষ্টা করছেন অনেকে।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা সায়েদুল হক বলেন, দেড় বছর আগে বিয়ের পর নতুন সংসার নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বাড়তি খরচের চাপে এখন সংসারের প্রতি বিরক্তি তৈরি হচ্ছে।

তার ভাষায়, আগে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার কথা ভাবলেও এখন অনেক কিছু বাদ দিতে হচ্ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্যের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানান তিনি।

সায়েদুলের দাবি, কয়েক মাস আগে এক হাজার টাকা বিদ্যুৎ রিচার্জ করে প্রায় ৩৫ দিন ব্যবহার করতে পারলেও বর্তমানে একই পরিমাণ অর্থে ২১-২২ দিনের বেশি চালানো যাচ্ছে না। তার অভিযোগ, গত তিন মাসে বিদ্যুৎ ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।

এলপিজির দাম নিয়েও ভোক্তাদের ভোগান্তি রয়েছে। ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম কয়েক মাসের ব্যবধানে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।

শুধু রান্না ও বিদ্যুৎ নয়, সাবান, শ্যাম্পু, কাপড় ধোয়ার পাউডারসহ নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দামও বেড়েছে। সায়েদুল জানান, আগে দুই মাসের টয়লেট্রিজ পণ্যের জন্য যেখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হতো, এখন একই পণ্যে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

নীরবে বাড়ছে পণ্যের দাম

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে দাম সরাসরি না বাড়িয়ে প্যাকেটের পরিমাণ কমানো হচ্ছে। অর্থনীতিতে এ ধরনের প্রবণতাকে বলা হয় ‘শ্রিংকফ্লেশন’

মোহাম্মদপুরের এক দোকানি জানান, একই দামে বিভিন্ন পণ্যের ওজন ধীরে ধীরে কমেছে। এক কেজি রিন পাউডারের দামও গত এক মাসে প্রায় ১৪৫-১৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১৭৫ টাকা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে ইউনিলিভার জানিয়েছে, কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধির পুরো চাপ ভোক্তার ওপর দেওয়া হয়নি। ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে বিভিন্ন ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।

খাবারের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে পুষ্টিকর খাবার

দ্রব্যমূল্যের চাপে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের খাদ্যতালিকায়।

মৌচাকের বাসিন্দা কবির আহমেদ একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন। পাঁচ সদস্যের সংসারে খরচ সামলাতে গিয়ে তাকে নিয়মিত মাছ-মাংস কেনা কমাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আগে সপ্তাহে অন্তত একদিন মাছ-মাংস রাখার চেষ্টা করতেন। এখন অনেক সময় মাংস বাদ দিয়ে মাছ বা ডিমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ডিমের দামও বেশি মনে হলে সেটিও কমিয়ে দিতে হচ্ছে।

কবিরের ভাষায়, “আগে বাজারে গিয়ে ভাবতাম কী খাব। এখন ভাবি, কী বাদ দিলে মাসটা চালানো যাবে।”

তার মতে, দুধ, ফল, মাছ-মাংসসহ পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ কমে গেছে। সন্তানদের পছন্দের খাবার কিনতে না পারাটাই তার কাছে সবচেয়ে কষ্টের।

চাল, তেল, ডিমসহ নিত্যপণ্যে বাড়তি চাপ

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক মাসে বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। খোলা আটার দাম প্রায় সাড়ে ১৪ শতাংশ বেড়ে ৬৫-৭০ টাকা কেজিতে উঠেছে। প্যাকেটজাত ময়দার দামও বেড়েছে।

পেঁয়াজের দামও ৪০-৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ৫৫-৬০ টাকা কেজি হয়েছে। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৮৫-১৯০ টাকা লিটার এবং পাম তেল ১৬৫-১৭০ টাকা লিটারে।

বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বর্তমানে প্রায় ২০০ টাকা লিটার। বাজারে সরবরাহ নিয়েও কিছু জায়গায় সংকটের অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে খামারের ডিমের ডজন ১২৫-১৩০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫-১৬০ টাকায় উঠেছে। ব্রয়লার মুরগির দামও কেজিপ্রতি প্রায় ১৯০-২০০ টাকার মধ্যে রয়েছে।

সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে স্বস্তি নেই

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।

তবে সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য থাকলেও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় বাজারের চাপ কমেনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় বাড়ায় তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

জ্বালানি সংকটকে বড় কারণ বলছেন অর্থনীতিবিদরা

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

তার মতে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ—কোনোটিই কাঙ্ক্ষিতভাবে সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, মানুষের স্বস্তির জন্য একদিকে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়াতে হবে। ভালো মজুরি ও স্থিতিশীল কর্মসংস্থান নিশ্চিত হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়বে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুর্শিদ মনে করেন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশের পর্যাপ্ত ‘বাফার’ বা মজুত ব্যবস্থা নেই। বৈশ্বিক বা স্থানীয় সরবরাহে সংকট তৈরি হলে তা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সীমিত আয়ের মানুষের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশেষ প্রতিবেদন

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ