
জাদুর মঞ্চের মানুষটি আসলে জীবনেরই এক বিস্ময়: জুয়েল আইচের মুক্তিযুদ্ধ, মানবিকতা ও আলাদা হয়ে ওঠার গল্প
নিজস্ব প্রতিবেদক | News for Justice
জাদুর মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষকে বিস্মিত করেছেন বছরের পর বছর। কখনো চোখের সামনে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন, কখনো বাঁশির সুরে মুগ্ধ করেছেন দর্শককে। কিন্তু কিংবদন্তি জাদুশিল্পী জুয়েল আইচের জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প হয়তো তাঁর জাদুর বাক্সে নয়—লুকিয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে, মানবিকতার প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতায় এবং মানুষের মুখে আনন্দ ফোটানোর দর্শনে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ‘আড্ডানামা’ অনুষ্ঠানে এসে নিজের জীবনের নানা অধ্যায় তুলে ধরেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ। তাঁর কথায় উঠে এসেছে শৈশবের দুষ্টুমি থেকে জাদুশিল্পী হয়ে ওঠা, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব এবং মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার স্বপ্ন।
শৈশবের কৌতূহল থেকেই জাদুর পথে
পিরোজপুরের সমুদয়কাঠি গ্রামের পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন জুয়েল আইচ। গ্রামে বেদের দল, সার্কাস আর নানা ধরনের কৌশল দেখে ছোটবেলা থেকেই তাঁর মনে জন্ম নেয় আলাদা কিছু করার আকাঙ্ক্ষা।

প্রথমে জাদুশিল্পী হওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু কৈশোরে এসে ম্যাজিকের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে ‘সাধনা লায়ন সার্কাস’-এর জাদুশিল্পী আব্দুর রশিদের কাছ থেকে হাতে-কলমে জাদু শেখার সুযোগ পান।
তবে অন্যদের মতো দর্শককে হাসিয়ে বা বিব্রত করে আনন্দ দেওয়ার পথে হাঁটেননি তিনি। এক দর্শককে মঞ্চে অপমানজনকভাবে হাসির পাত্র বানানোর একটি ঘটনা তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে।
সেখান থেকেই তাঁর জীবনদর্শনের জন্ম—“আনন্দ দিয়ে আনন্দ পাব।”
দর্শককে সম্মান দিয়েই নিজের শিল্পকে মানুষের আনন্দের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
জাদুর মানুষটি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধাও
১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার ডাক তাঁকে ঘরে বসিয়ে রাখতে পারেনি। পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি বাদ দিয়ে বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তিনি।
তখন হাতে আধুনিক অস্ত্র ছিল না। ছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল। বিপরীতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ছিল মেশিনগানসহ ভারী অস্ত্র।
রণাঙ্গনের ভয়াবহতা নিজের চোখে দেখেছেন জুয়েল আইচ। সহযোদ্ধাদের একের পর এক মৃত্যুও প্রত্যক্ষ করেছেন।
তাঁর ভাষায়, পতঙ্গের মতো তাঁর বন্ধুরা মারা গেছেন। অনেককে যথাযথভাবে দাফন করার সুযোগও হয়নি। কোনো রকমে মাটি চাপা দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে যুদ্ধের পথে।
এই স্মৃতি আজও তাঁর জীবনের অন্যতম গভীর ক্ষত হয়ে আছে।
এক পা হারানোর মুখ থেকেও ফিরে এসেছিলেন
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যাওয়ার পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন জুয়েল আইচ। তাঁর পায়ে গ্যাংগ্রিন ধরা পড়ে।
দমদম ক্যান্টনমেন্টে চিকিৎসার জন্য নেওয়ার পর চিকিৎসকদের এক পর্যায়ে তাঁর পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়।
কিন্তু সুদেব নামে এক তরুণ চিকিৎসকের প্রচেষ্টায় বদলে যায় সেই সিদ্ধান্ত। চিকিৎসার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত পা রক্ষা পায় জুয়েল আইচের।
আজও সেই চিকিৎসককে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, সুদেব ছিলেন ‘দেবতার মতো’।
পা হারানোর আশঙ্কা থেকে ফিরে এসে আবারও জীবনের পথে হাঁটেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সেই পথই তাঁকে নিয়ে যায় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় জাদুশিল্পীর আসনে।
পুড়ে ছাই হয়েছিল জাদুর সব সরঞ্জাম
জাদুশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পথটিও সহজ ছিল না। ১৯৭৭ সালে এক অগ্নিকাণ্ডে তাঁর বন্ধুর বাড়ির সঙ্গে পুড়ে যায় জুয়েল আইচের জাদুর সব সরঞ্জাম।
একদিকে সবকিছু হারানোর কষ্ট, অন্যদিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে একের পর এক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার ডাক—কিন্তু সরঞ্জাম না থাকায় যেতে পারছিলেন না তিনি।
শেষ পর্যন্ত বন্ধু জোর করে তাঁকে ঢাকায় পাঠান। সেই সময় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। এরপর বিটিভির পর্দায় একের পর এক অনুষ্ঠানে জাদু দেখিয়ে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন জুয়েল আইচ।
দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও বাংলাদেশের মুখ
১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সোসাইটি অব আমেরিকান ম্যাজিশিয়ানস’-এর আমন্ত্রণ পান তিনি। পরের বছর সরকারি সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে জাদু প্রদর্শন করেন।
সেখানেই তাঁর জীবনে আসে আরেক বিস্ময়কর ঘটনা। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ও অভিনেতা অরসন ওয়েলস তাঁর জাদু দেখে প্রশংসা করেন।
জুয়েল আইচের জাদুর মধ্যে গল্প বলার ক্ষমতা এবং সেই গল্পের মাধ্যমে নিজের দেশকে তুলে ধরার বিষয়টি ওয়েলসের নজর কাড়ে। এমনকি চলচ্চিত্র পরিচালনার ওপর পড়াশোনার জন্য তাঁকে হলিউড ফিল্ম স্কুলে যাওয়ার সুযোগ করে দেন তিনি।
বন্ধুত্বের আরেক নাম হুমায়ূন আহমেদ
নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গেও ছিল তাঁর গভীর বন্ধুত্ব।
পিরোজপুরে পরিচয়ের সূত্র ধরে পরে ঢাকায় সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। একসময় দুজনের বন্ধুত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে একজন আরেকজনকে ছাড়া চলতে পারতেন না—জুয়েল আইচের বর্ণনায় তাঁরা ছিলেন ‘হরিহর আত্মা’।
শেষ ইচ্ছাতেও মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার স্বপ্ন
জীবনের শেষ অধ্যায় নিয়েও জুয়েল আইচের ভাবনা অন্যদের চেয়ে আলাদা।
মরণোত্তর দেহদানের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি। এমনকি মৃত্যুর পর তাঁর অঙ্গগুলোও যেন মানুষের কাজে লাগে—এই আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছেন।
তাঁর দর্শন খুব সরল—মানুষকে দিয়েই আনন্দ পেতে চান তিনি, মানুষের উপকারেই নিজের জীবনকে অর্থবহ করতে চান।
আজকের জুয়েল আইচ তাই শুধু একজন জাদুশিল্পীর নাম নয়। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন শিল্পী, একজন বাঁশিবাদক, একজন গল্পকথক এবং সর্বোপরি একজন মানবিক মানুষ।
জাদুর মঞ্চে তিনি মানুষকে বিস্মিত করেছেন; কিন্তু তাঁর জীবনকাহিনি আরও বড় এক সত্য সামনে আনে—যে মানুষ অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন, তাঁর জীবন নিজেই এক অনন্য জাদু।
জুয়েল আইচের নিজের কথাতেই যেন সেই জীবনের সারকথা—“একটা সুন্দর পরিচ্ছন্ন জীবন কাটিয়ে চলে যেতে চাই।”

