ঢাকা: অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) আসন্ন নির্বাচন স্থগিত করেছে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই’র আরবিট্রেশন বোর্ড। ভোটার তালিকায় মৃত ও ভুয়া ব্যক্তি অন্তর্ভুক্তি, লাইসেন্সবিহীন সংস্থাকে ভোটার করা, প্রশাসকের মেয়াদ না থাকার পরও অবৈধভাবে বোর্ড গঠন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নজিরবিহীন জালিয়াতির সত্যতা পাওয়ায় এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আটাবের সাধারণ সদস্যদের পক্ষ থেকে দায়েরকৃত অভিযোগ এবং শুনানির পর এফবিসিসিআই আরবিট্রেশন বোর্ড এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
নির্বাচন স্থগিতের নেপথ্যে যেসব গুরুতর অনিয়ম:
মেয়াদোত্তীর্ণ প্রশাসকের অবৈধ সিদ্ধান্ত: নিয়মানুযায়ী প্রশাসকের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার থাকে না। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সম্পূর্ণ অবৈধভাবে নির্বাচন বোর্ড ও আপিল বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়।
মৃত ও ভুয়া ভোটারের ছড়াছড়ি: প্রাথমিক ভোটার তালিকায় ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তালিকায় এমন অনেককে ভোটার করা হয়েছে যারা দীর্ঘদিন আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। এ ছাড়াও অসংখ্য ভুয়া নাম এবং অস্তিত্বহীন ও লাইসেন্সবিহীন ট্রাভেল এজেন্সিকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে একতরফা নির্বাচনের নীলনকশা সাজানো হয়।
আপিল বোর্ডের জালিয়াতি: আপিল শুনানির ক্ষেত্রেও চরম আইনি ব্যত্যয় ঘটেছে। বোর্ডের তিন সদস্যের মধ্যে মাত্র দুইজনের উপস্থিতিতে বেআইনিভাবে শুনানি সম্পন্ন করা হয়। অথচ পরবর্তীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে রায় প্রদানের নথিতে তিন সদস্যেরই স্বাক্ষর দেখিয়ে রায় প্রকাশ করা হয়।
ব্যাকডেটে স্বাক্ষর ও নথিপত্র জালিয়াতি: নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আপিল বোর্ডের নথিতে পেছনের তারিখ (ব্যাকডেট) দেখিয়ে স্বাক্ষর করার মতো মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের দ্বিমুখী নীতি ও দুর্নীতি: নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আটাব প্রশাসক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে চরম দায়িত্বহীনতা, পক্ষপাতিত্ব এবং প্রত্যক্ষ দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
এফবিসিসিআই আরবিট্রেশন বোর্ডের পর্যবেক্ষণ:
আরবিট্রেশন বোর্ডের শুনানিতে উল্লেখ করা হয় যে, একটি প্রতিষ্ঠিত ও গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে এ ধরনের জালিয়াতি দেশের বাণিজ্য কাঠামোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে। যেখানে ভোটার তালিকায় মৃত ব্যক্তি ও ভুয়া লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের নাম থাকে এবং আপিল প্রক্রিয়াতেই জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়, সেখানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। একটি স্বচ্ছ ও ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা এবং বৈধ পরিচালনা পর্ষদ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কার্যক্রম স্থগিত রাখা হলো।
এদিকে, স্থগিতাদেশের পর আটাবের সাধারণ সদস্যদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রাভেল এজেন্সির মালিক বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেট ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে কথা বলে আসছিলাম। মৃত ব্যক্তি ও ভুয়া ট্রাভেল এজেন্সির নাম দিয়ে পকেট কমিটি বানানোর যে ষড়যন্ত্র চলছিল, এফবিসিসিআই-এর এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা ভেস্তে গেছে। আমরা একটি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন দাবি করছি।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আটাব নির্বাচনের সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

