
খাল-নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত, কমছে জলাভূমির আয়তন; বিলুপ্তির পথে দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য
News For Justice | বিশেষ প্রতিবেদন
একসময় বর্ষা এলেই দিগন্তজোড়া জলরাশিতে প্রাণ ফিরে পেত দেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলনবিল। নদ-নালা ও খালের প্রবাহে সমৃদ্ধ এই বিল ছিল উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। দেশীয় মাছের প্রাচুর্য, নৌপথের যোগাযোগ এবং শীতকালে অতিথি পাখির কোলাহলে মুখর থাকত পুরো বিলাঞ্চল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্যবাহী চলনবিল এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, নদ-খালের নাব্যতা হ্রাস, জলাভূমি ভরাট, নির্বিচারে পুকুর খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব চলনবিলের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

একসময় এক হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত এই জলাভূমির আয়তন বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
চলনবিলের ৪৭টি নদী ও অসংখ্য খালের অনেকগুলোই এখন পলি জমে নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং দেশীয় মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। একসময় এই বিলের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে জীবিকা নির্বাহ করলেও বর্তমানে তাদের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চলনবিলের ভেতরে অপরিকল্পিতভাবে সড়ক, বাঁধ, কালভার্ট, গ্রোথ সেন্টার, পোল্ডার ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধ জাল ব্যবহারের কারণে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছও দ্রুত বিলুপ্তির পথে।

সিংড়া চলনবিল পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন ও জলাভূমি ভরাটের কারণে চলনবিল প্রতিনিয়ত তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। তিনি পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং জলাভূমি সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
নাটোর বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদ-খালের নাব্যতা হ্রাস, পলি জমা এবং খালের মুখে বাঁধ নির্মাণ চলনবিল সংকটের অন্যতম কারণ। তিনি নিয়মিত খাল খনন, পলি অপসারণ এবং পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পরিবেশবিদদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমি তার ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত গুরুত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক

