ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি আয়করের বিষয়ে হাইকোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে তার দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে তদন্তের দাবি উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের আয়কর সংক্রান্ত পৃথক দুটি রিট খারিজ করে দেন। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, রায়ের ফলে গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়কর পরিশোধ করতে হবে।
হাইকোর্টের এই রায়ের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত, গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পাওয়া এবং তার ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলা ও অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি সামনে এসেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি মতামতধর্মী প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে বিস্তারিত অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন, নিবন্ধন, কর-সুবিধা ও অন্যান্য সুযোগ পেয়েছে।
এর মধ্যে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স এবং গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
ড. ইউনূসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রামীণ ব্যাংকের কর-সুবিধা এবং ব্যাংকটিতে সরকারের শেয়ারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া ড. ইউনূস ও গ্রামীণ টেলিকমের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের মামলার পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনা করে আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অর্থপাচার মামলায় তিনি খালাস পান। একইভাবে, দায়িত্ব গ্রহণের আগের দিন শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ড. ইউনূসসহ গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালকদের দেওয়া ছয় মাসের কারাদণ্ডের রায়ও পরবর্তী সময়ে বাতিল হয়ে যায়।
এসব বিচারিক সিদ্ধান্ত কোনো ধরনের প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার বা আইনগত অনিয়মের মাধ্যমে হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
ইউনূস সরকারের সময়ে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত আদেশ জারি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সংসদের অনুমোদন ছাড়া এমন আদেশ জারির এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল কি না, তা আইনগতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে ওই আদেশে স্বাক্ষরের বিষয়ে চাপ প্রয়োগের অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবিও জানানো হয়েছে।
ইউনূস সরকারের সময়ে বিভিন্ন পেশাজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং সম্পত্তি ও ব্যাংক হিসাব জব্দের মতো ঘটনার অভিযোগ তুলে সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিশেষ করে পেশা ও ব্যবসা পরিচালনার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, চলাফেরা ও সমাবেশের অধিকারসহ সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো যথাযথভাবে সুরক্ষিত ছিল কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং সরকারি নথি যাচাই করে সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি।
ইউনূস সরকারের সময়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
এসব ঘটনায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে হাম রোগের টিকাদান কার্যক্রম নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ইউনূস সরকারের সময়ে শিশুদের হাম টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে এবং এর ফলে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে ড. ইউনূস এবং তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব ও ভূমিকা তদন্তের দাবি করা হয়েছে।
তবে শিশু মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা, মৃত্যুর কারণ, টিকাদান কার্যক্রমের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও অন্যান্য সরকারি তথ্য-উপাত্তের পাশাপাশি স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি দায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত ভিত্তি হবে।
ইউনূস সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকার দাবি করে সেগুলোও তদন্তের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগের ক্ষেত্রেও যথাযথ যাচাই ছাড়া কাউকে দায়ী না করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন আইন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হাইকোর্টের আয়কর মামলার রায়কে কেন্দ্র করে মূলত একটি প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে—ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কতটা আইনসম্মত ছিল এবং কোথাও ক্ষমতার অপব্যবহার বা স্বার্থের সংঘাত ঘটেছিল কি না।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে সরকারি নথি, আদালতের রায়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও আইনগত তথ্য পর্যালোচনা করে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি—উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
প্রধান সম্পাদক : সালমান মাহমুদ
18/1 Naya polton, 2nd floor, Dhaka -1000, Bangladesh.
+880 1979-778844, +880 1712-027525
Justice Media Ltd. এর একটি প্রতিষ্ঠান
© Copyright - newsforjustice.com