ঢাকা ০২:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪

পোড়া চিনির তীব্র গন্ধ

হুমকির মুখে কর্ণফুলীর জীববৈচিত্র্য

চট্টগ্রাম প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ১২:৪৭:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মার্চ ২০২৪ ১৩২ বার পড়া হয়েছে

ফাইল ফটো

নিউজ ফর জাস্টিস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

Biodiversity :

অগ্নিকাণ্ডের পর চট্টগ্রামের এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের গুদামের অপরিশোধিত চিনিগলা পানি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিশছে। এতে সেই এলাকায় নদীর পানি কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। কারখানার আশপাশের রাস্তাঘাটে জমে রয়েছে পোড়া চিনির পানি। পুরো এলাকায় পোড়া চিনির তীব্র গন্ধ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এস আলম গ্রুপের চিনিকল এস আলম সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের এই আগুনের মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে কর্ণফুলী নদীতে। কারণ ওইসব গলিত তরল ও ভস্মীভূত ছাইয়ে দূষিত হচ্ছে পানি যা নদীর মাছসহ জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য হুমকির কারণ। দূষণের তদন্তে নেমে পরিবেশ অধিদফতর এরই মধ্যে নদী থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করেছে।

কারখানার যে গুদামটি আগুনে পুড়েছে তার আয়তন ৬৫ হাজার ৭০০ বর্গফুট। মূল ফটক থেকে গুদাম পর্যন্ত পুরো রাস্তায় অপরিশোধিত চিনি গলে পরিণত হওয়া তরল পড়ে লালচে কালো কাদায় পরিণত হয়েছে। সেগুলো নালার মতো হয়ে চলে যাচ্ছে কারখানার একেবারে পেছনে কর্ণফুলী নদীতে। গলে যাওয়া গরম চিনির তরলের ওপর হেঁটে প্রতিষ্ঠানের পেছনে গিয়ে দেখা গেছে এ চিত্র।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ড. ইদ্রিস আলী বলেন, শিল্প কারখানা গড়ে তোলার আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা উচিত ছিল। তারা ডাম্পিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখেনি। এ কারণে কারখানা থেকে পোড়া বর্জ্য পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। এতে নদীর পানি দূষিত হবে। ক্ষতি হবে মৎস্য সম্পদ এবং জীব-বৈচিত্র্য। এস আলম গ্রুপ হয়তো পুড়ে যাওয়া সম্পদের ক্ষতি এক সময় পোষাতে পারবে। পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তা আর পূরণ হবে না। এ জন্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সজাগ হতে হবে।

চট্টগ্রামের ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ হারুন পাশা বলেন, যে গুদাম পুড়েছে এখানে সব ছিল অপরিশোধিত চিনি। অপরিশোধিত চিনি মূলত কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের একটি যৌগ। কার্বন ও অক্সিজেন দুটিই আগুন জ্বলতে সহায়তা করে। ৩৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় অপরিশোধিত চিনি গলে গিয়ে ভোলাটাইল কেমিকেলে (ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক) পরিণত হয়।

হালদা নদী গবেষক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, পুড়ে যাওয়া চিনি নদীতে পড়লে অবশ্যই নদীর ক্ষতি হবে। চিনি হোক আর যা হোক- এগুলো এক্সট্রা কেমিক্যাল। এগুলো পানির কোয়ালিটি নষ্ট করবে। এতে পানিতে অক্সিজেনের শূন্যতা সৃষ্টি হবে। এ কারণে পানিতে থাকা জীব-বৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হবে। তাই এসব যাতে নদীতে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে জোয়ার-ভাটার কারণে এই সমস্যা এক সময় পূরণ হবে। তাও সময় সাপেক্ষ।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রহমান বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার এসব লাভা যে কর্ণফুলী নদীতে যাচ্ছে তা আমার জানা ছিল না। বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ প্রসঙ্গে এস আলম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিন) আকতার হাসান বলেন, আগুনে পোড়া চিনি কর্ণফুলীতে যাচ্ছে না। এসব নিজস্ব জমিতে ডাম্পিং করা হচ্ছে। আর নদীতে গেলেও তা নদী কিংবা জীব-বৈচিত্র্যের কোনও ক্ষতি হবে না। কেননা এখানে কোনও ক্ষতিকর রাসায়নিক নেই।

ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক (প্রশাসন অর্থ) জসিম উদ্দিন বলেন, যেখানে আগুন লেগেছে সেটিতে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত চিনি মজুত ছিল। এগুলো এক ধরনের দাহ্য পদার্থ।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী অ্যাংকারেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক শহীদুল ইসলাম জানান, নদী অথবা সমুদ্রের পানিতে যখন অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার চিনি (রসায়নের ভাষায় যেটাকে সুক্রোজ বলা হয়ে থাকে যা মূলত গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ) অধিক মাত্রায় মিশ্রিত হবে তখন এটা পানির পুষ্টিমান বাড়িয়ে দিতে পারে যা পরে ইউট্রোফিকেশন ঘটাতে পারে। ফলে পানিতে অতিরিক্ত শৈবাল ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ ও ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

শহীদুল বলেন, পানিতে অতিরিক্ত চিনি ক্ষতিকারক অ্যালগাল ব্লুম (শৈবালের অতিবৃদ্ধি) বৃদ্ধিতে সহায়তা করে যা মানুষ, প্রাণী ও অন্যান্য জলজ জীবের জন্য ক্ষতিকারক বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত চিনির ফলে দূষিত ভূপৃষ্ঠস্থ পানিতে অর্গানিক কার্বনের মাত্রাও বাড়বে যা পানির গুণাগুণ নষ্ট করে জলজ প্রাণীর জন্য হুমকির কারণ হবে।

জানা গেছে, সোমবার (৪ মার্চ) বিকাল ৩টা ৫৩ মিনিটে নগরীর কর্ণফুলী থানাধীন মইজ্যারটেক ইছাপুর এলাকায় অবস্থিত চিনি কারখানায় আগুন লাগে। এখন পর্যন্ত আগুন জ্বলছে।

/শিল্পী/

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

পোড়া চিনির তীব্র গন্ধ

হুমকির মুখে কর্ণফুলীর জীববৈচিত্র্য

আপডেট সময় : ১২:৪৭:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মার্চ ২০২৪

Biodiversity :

অগ্নিকাণ্ডের পর চট্টগ্রামের এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের গুদামের অপরিশোধিত চিনিগলা পানি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিশছে। এতে সেই এলাকায় নদীর পানি কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। কারখানার আশপাশের রাস্তাঘাটে জমে রয়েছে পোড়া চিনির পানি। পুরো এলাকায় পোড়া চিনির তীব্র গন্ধ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এস আলম গ্রুপের চিনিকল এস আলম সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের এই আগুনের মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে কর্ণফুলী নদীতে। কারণ ওইসব গলিত তরল ও ভস্মীভূত ছাইয়ে দূষিত হচ্ছে পানি যা নদীর মাছসহ জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য হুমকির কারণ। দূষণের তদন্তে নেমে পরিবেশ অধিদফতর এরই মধ্যে নদী থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করেছে।

কারখানার যে গুদামটি আগুনে পুড়েছে তার আয়তন ৬৫ হাজার ৭০০ বর্গফুট। মূল ফটক থেকে গুদাম পর্যন্ত পুরো রাস্তায় অপরিশোধিত চিনি গলে পরিণত হওয়া তরল পড়ে লালচে কালো কাদায় পরিণত হয়েছে। সেগুলো নালার মতো হয়ে চলে যাচ্ছে কারখানার একেবারে পেছনে কর্ণফুলী নদীতে। গলে যাওয়া গরম চিনির তরলের ওপর হেঁটে প্রতিষ্ঠানের পেছনে গিয়ে দেখা গেছে এ চিত্র।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ড. ইদ্রিস আলী বলেন, শিল্প কারখানা গড়ে তোলার আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা উচিত ছিল। তারা ডাম্পিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখেনি। এ কারণে কারখানা থেকে পোড়া বর্জ্য পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। এতে নদীর পানি দূষিত হবে। ক্ষতি হবে মৎস্য সম্পদ এবং জীব-বৈচিত্র্য। এস আলম গ্রুপ হয়তো পুড়ে যাওয়া সম্পদের ক্ষতি এক সময় পোষাতে পারবে। পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তা আর পূরণ হবে না। এ জন্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সজাগ হতে হবে।

চট্টগ্রামের ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ হারুন পাশা বলেন, যে গুদাম পুড়েছে এখানে সব ছিল অপরিশোধিত চিনি। অপরিশোধিত চিনি মূলত কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের একটি যৌগ। কার্বন ও অক্সিজেন দুটিই আগুন জ্বলতে সহায়তা করে। ৩৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় অপরিশোধিত চিনি গলে গিয়ে ভোলাটাইল কেমিকেলে (ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক) পরিণত হয়।

হালদা নদী গবেষক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, পুড়ে যাওয়া চিনি নদীতে পড়লে অবশ্যই নদীর ক্ষতি হবে। চিনি হোক আর যা হোক- এগুলো এক্সট্রা কেমিক্যাল। এগুলো পানির কোয়ালিটি নষ্ট করবে। এতে পানিতে অক্সিজেনের শূন্যতা সৃষ্টি হবে। এ কারণে পানিতে থাকা জীব-বৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হবে। তাই এসব যাতে নদীতে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে জোয়ার-ভাটার কারণে এই সমস্যা এক সময় পূরণ হবে। তাও সময় সাপেক্ষ।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রহমান বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার এসব লাভা যে কর্ণফুলী নদীতে যাচ্ছে তা আমার জানা ছিল না। বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ প্রসঙ্গে এস আলম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিন) আকতার হাসান বলেন, আগুনে পোড়া চিনি কর্ণফুলীতে যাচ্ছে না। এসব নিজস্ব জমিতে ডাম্পিং করা হচ্ছে। আর নদীতে গেলেও তা নদী কিংবা জীব-বৈচিত্র্যের কোনও ক্ষতি হবে না। কেননা এখানে কোনও ক্ষতিকর রাসায়নিক নেই।

ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক (প্রশাসন অর্থ) জসিম উদ্দিন বলেন, যেখানে আগুন লেগেছে সেটিতে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত চিনি মজুত ছিল। এগুলো এক ধরনের দাহ্য পদার্থ।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী অ্যাংকারেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক শহীদুল ইসলাম জানান, নদী অথবা সমুদ্রের পানিতে যখন অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার চিনি (রসায়নের ভাষায় যেটাকে সুক্রোজ বলা হয়ে থাকে যা মূলত গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ) অধিক মাত্রায় মিশ্রিত হবে তখন এটা পানির পুষ্টিমান বাড়িয়ে দিতে পারে যা পরে ইউট্রোফিকেশন ঘটাতে পারে। ফলে পানিতে অতিরিক্ত শৈবাল ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ ও ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

শহীদুল বলেন, পানিতে অতিরিক্ত চিনি ক্ষতিকারক অ্যালগাল ব্লুম (শৈবালের অতিবৃদ্ধি) বৃদ্ধিতে সহায়তা করে যা মানুষ, প্রাণী ও অন্যান্য জলজ জীবের জন্য ক্ষতিকারক বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত চিনির ফলে দূষিত ভূপৃষ্ঠস্থ পানিতে অর্গানিক কার্বনের মাত্রাও বাড়বে যা পানির গুণাগুণ নষ্ট করে জলজ প্রাণীর জন্য হুমকির কারণ হবে।

জানা গেছে, সোমবার (৪ মার্চ) বিকাল ৩টা ৫৩ মিনিটে নগরীর কর্ণফুলী থানাধীন মইজ্যারটেক ইছাপুর এলাকায় অবস্থিত চিনি কারখানায় আগুন লাগে। এখন পর্যন্ত আগুন জ্বলছে।

/শিল্পী/