ঢাকা ১১:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪

রোজা আসতেই চড়া মসলার বাজার

চট্টগ্রাম প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৩:১৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মার্চ ২০২৪ ৯৫ বার পড়া হয়েছে

ফাইল ফটো

নিউজ ফর জাস্টিস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

spice market :

রোজা আসতেই চড়া মসলার বাজার। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ মসলার বড় একটি অংশই ঢোকে দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে। এখান থেকেই এসব মসলা পাইকারিতে নিয়ে যাওয়া হয় সারা দেশে। মসলার বড় একটি অংশই আমদানি হয় গুয়েতেমালা, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, মাদাগাস্কার, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মতো প্রায় ২৩টি দেশ থেকে। এদিকে রোজা আসতেই এই বাজারেই জেঁকে বসেছে সিন্ডিকেট। আমদানি মূল্যের দ্বিগুণ দামে মসলা বিক্রি করছে তারা। এতে খুচরা ও পাইকারি উভয় বাজারে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিতিশীলতা। নাজেহাল অবস্থা ভোক্তাদের।

জানা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় মসলা বাজার খাতুনগঞ্জে গত অক্টোবরে কেজিপ্রতি এলাচ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে। একই মানের এলাচ এখন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। গত অক্টোবরে কেজিপ্রতি লবঙ্গ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৪৫০। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭৫০ থেকে ২ হাজার টাকায়। ওই সময় কেজিপ্রতি দারুচিনি বিক্রি হয়েছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। কেজিপ্রতি গোলমরিচ বিক্রি হয়েছিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭০০ টাকা।

একই অবস্থা জায়ফলের দামে। ৬০০ টাকার জায়ফল এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকার উপরে। ২০-৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে মিষ্টি জিরার দামও। কেজিপ্রতি মিষ্টি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকার উপরে। এ ছাড়া গত অক্টোবরে প্রতি কেজি ভারতীয় হলুদ বিক্রি হয়েছে ১৭০-১৮০ টাকা দরে। এখন এই হলুদ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। দেশি হলুদ ছিল ২০০ টাকার নিচে। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকার উপরে। কালিজিরার দামও ১০-১৫ টাকা বেড়ে ২৪০, মেথির দাম ১০-১৫ টাকা বেড়ে ১২৫, ধনিয়ার দাম ২০-২৫ টাকা বেড়ে ১৮৫, রাঁধুনির দাম ৫০-৬০ টাকা বেড়ে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রমজান উপলক্ষে ভোগ্যপণ্যের কোনো ঘাটতি হবে না বলে আমদানিকারক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সবসময় বলা হয়। তবে পণ্যের সরবরাহে যদি কৃত্রিম সংকট না হয় এবং সরকার যদি আমদানিকারক থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত তদারকি জোরদার করে তাহলে রমজানে দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ায়। তাই রমজানে প্রশাসনকে অবশ্যই কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এবার রোজার আগেই কঠোর হতে দেখা গেছে প্রশাসনকে। গত সোমবার (৪ মার্চ) দুপুরে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্তের নেতৃত্বে খাতুনগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। এ সময় ছয় প্রতিষ্ঠানকে ৫১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

তিনি বলেন, এলাচের আমদানি এবং বিক্রয় মূল্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। মাত্র সাড়ে সাত ডলার কেজি দরে এলাচ আমদানি করা হচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর দাম হবে সর্বোচ্চ সাড়ে ৭০০ টাকা। এর ওপর ৫৯ শতাংশ ট্যাক্স। তারপর বন্দরের চার্জ ও ক্যারিং কস্টসহ সবকিছু মিলিয়ে এক কেজি এলাচের সর্বোচ্চ মূল্য হতে পারে ১ হাজার ৪০০ বা ১ হাজার ৫০০ টাকা। এর বেশি হওয়া যৌক্তিক নয়। কিন্তু পাইকারি বাজারে এলাচ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ বা ২ হাজার ৬০০ টাকায়। খুচরা পর্যায়ে দাম আরও বেশি।

অভিযানে এলাচের অন্যতম প্রধান আমদানিকারক মেসার্স আবু মোহাম্মদ অ্যান্ড কোম্পানিকে আমদানি মূল্যের অতিরিক্ত দামে বিক্রির দায়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্ত বলেন, তিনি একজন আমদানিকারক। অথচ কোনো ক্রয়-বিক্রয় রসিদ সংরক্ষণ করেননি। এজন্য উনাকে জরিমানা করা হয়েছে। রমজান সামনে রেখে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে অতিরিক্ত লাভ করতে না পারে বা বাজারে কোনো পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে। আমরা আরও অভিযান পরিচালনা করব।

অভিযানে মূল্য তালিকা ও ক্রয়-বিক্রয় রসিদ না রাখার অভিযোগে খাতুনগঞ্জের মদিনা ট্রেডার্সকে ১০ হাজার, আজমির ভান্ডারকে ৩ হাজার এবং ফারুক ট্রেডার্সকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এরপর সরাসরি ডিও/এসও বিক্রির দায়ে ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজকে ১০ হাজার এবং দ্বীন অ্যান্ড কোম্পানিকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এদিকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয় পেঁয়াজ, রসুন, দারুচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল, জয়ত্রী, এলাচ, ধনিয়া, জিরা, আদা, হলুদসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ৩০ হাজার ৭১৭ টনের বেশি মসলা। ২০২২ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয় ১ লাখ ৫১ হাজার ৯৩৩ টন মসলা। গত বছর আমদানি হয় ১ লাখ ৮২ হাজার ৬৫০ টন। মসলা আমদানির মাধ্যমে ২০২২ সালে ৪৫৩ কোটি ৪৮ লাখ ১৬ হাজার ৮০৯ টাকা রাজস্ব আয় করে কাস্টমস। গত বছর আয় হয় ৬৬৩ কোটি ৭৯ লাখ ৪৫ হাজার ৮০৬ টাকা।

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই আমদানি হয়েছে ২ হাজার ৪১৯ মেট্রিক টন এলাচ। শুধু ডিসেম্বর মাসেই এসেছে ৮২ মেট্রিক টন এলাচ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এলাচ এসেছে ৪ হাজার ৮৪৪ মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছে ৩ হাজার ৯০৬ মেট্রিক টন।

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই আমদানি হয়েছে ৪ হাজার ৪৭০ মেট্রিক টন দারুচিনি। শুধু ডিসেম্বরই এসেছে ৬৯৮ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছে ১৫ হাজার ৭৫২ মেট্রিক টন দারুচিনি। ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছে ১০ হাজার ৮১৫ মেট্রিক টন দারুচিনি।

গত ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ৩৩ মেট্রিক টন লবঙ্গ। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই আমদানি হয়েছে ৪২২ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসেছে ১ হাজার ২৭৫ মেট্রিক টন লবঙ্গ। আগের অর্থবছরে এসেছে ১ হাজার ৯৬২ মেট্রিক টন।

অন্যদিকে চাহিদার পাশাপাশি জিরার আমদানিও বেড়েছে। শুধু ডিসেম্বরই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ৪ হাজার ৭৪১ মেট্রিক টন জিরা। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসেই আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ৩০ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসেছে ৩ হাজার ৬৬৯ মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছে ১৮ হাজার ১০৬ মেট্রিক টন জিরা।

খাতুনগঞ্জের মেসার্স রহমান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মসলাপণ্যের বুকিং দর, জ্বালানি খরচ ও পরিবহন খরচ বাড়লেও এ বাড়তি দরের আওতায় আমদানি করা মসলা এখনো দেশে পৌঁছায়নি। বড় আমদানিকারকরা আগেই কম দামে মসলাপণ্য আমদানি করে মজুদ করে রেখেছিলেন। এখন বাড়তি দামের সুযোগে তারা আগের আমদানি করা এসব মসলা বাজারে ছাড়ছেন। ফলে ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের পকেটে বাড়তি লাভ ঢুকছে। কিছুদিনের মধ্যে বাড়তি বুকিং দরে আমদানি করা মসলা বাজারজাত শুরু হলে পণ্যগুলোর দাম আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।

/শিল্পী/

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

রোজা আসতেই চড়া মসলার বাজার

আপডেট সময় : ০৩:১৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মার্চ ২০২৪

spice market :

রোজা আসতেই চড়া মসলার বাজার। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ মসলার বড় একটি অংশই ঢোকে দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে। এখান থেকেই এসব মসলা পাইকারিতে নিয়ে যাওয়া হয় সারা দেশে। মসলার বড় একটি অংশই আমদানি হয় গুয়েতেমালা, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, মাদাগাস্কার, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মতো প্রায় ২৩টি দেশ থেকে। এদিকে রোজা আসতেই এই বাজারেই জেঁকে বসেছে সিন্ডিকেট। আমদানি মূল্যের দ্বিগুণ দামে মসলা বিক্রি করছে তারা। এতে খুচরা ও পাইকারি উভয় বাজারে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিতিশীলতা। নাজেহাল অবস্থা ভোক্তাদের।

জানা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় মসলা বাজার খাতুনগঞ্জে গত অক্টোবরে কেজিপ্রতি এলাচ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে। একই মানের এলাচ এখন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। গত অক্টোবরে কেজিপ্রতি লবঙ্গ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৪৫০। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭৫০ থেকে ২ হাজার টাকায়। ওই সময় কেজিপ্রতি দারুচিনি বিক্রি হয়েছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। কেজিপ্রতি গোলমরিচ বিক্রি হয়েছিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭০০ টাকা।

একই অবস্থা জায়ফলের দামে। ৬০০ টাকার জায়ফল এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকার উপরে। ২০-৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে মিষ্টি জিরার দামও। কেজিপ্রতি মিষ্টি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকার উপরে। এ ছাড়া গত অক্টোবরে প্রতি কেজি ভারতীয় হলুদ বিক্রি হয়েছে ১৭০-১৮০ টাকা দরে। এখন এই হলুদ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। দেশি হলুদ ছিল ২০০ টাকার নিচে। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকার উপরে। কালিজিরার দামও ১০-১৫ টাকা বেড়ে ২৪০, মেথির দাম ১০-১৫ টাকা বেড়ে ১২৫, ধনিয়ার দাম ২০-২৫ টাকা বেড়ে ১৮৫, রাঁধুনির দাম ৫০-৬০ টাকা বেড়ে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রমজান উপলক্ষে ভোগ্যপণ্যের কোনো ঘাটতি হবে না বলে আমদানিকারক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সবসময় বলা হয়। তবে পণ্যের সরবরাহে যদি কৃত্রিম সংকট না হয় এবং সরকার যদি আমদানিকারক থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত তদারকি জোরদার করে তাহলে রমজানে দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ায়। তাই রমজানে প্রশাসনকে অবশ্যই কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এবার রোজার আগেই কঠোর হতে দেখা গেছে প্রশাসনকে। গত সোমবার (৪ মার্চ) দুপুরে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্তের নেতৃত্বে খাতুনগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। এ সময় ছয় প্রতিষ্ঠানকে ৫১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

তিনি বলেন, এলাচের আমদানি এবং বিক্রয় মূল্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। মাত্র সাড়ে সাত ডলার কেজি দরে এলাচ আমদানি করা হচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর দাম হবে সর্বোচ্চ সাড়ে ৭০০ টাকা। এর ওপর ৫৯ শতাংশ ট্যাক্স। তারপর বন্দরের চার্জ ও ক্যারিং কস্টসহ সবকিছু মিলিয়ে এক কেজি এলাচের সর্বোচ্চ মূল্য হতে পারে ১ হাজার ৪০০ বা ১ হাজার ৫০০ টাকা। এর বেশি হওয়া যৌক্তিক নয়। কিন্তু পাইকারি বাজারে এলাচ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ বা ২ হাজার ৬০০ টাকায়। খুচরা পর্যায়ে দাম আরও বেশি।

অভিযানে এলাচের অন্যতম প্রধান আমদানিকারক মেসার্স আবু মোহাম্মদ অ্যান্ড কোম্পানিকে আমদানি মূল্যের অতিরিক্ত দামে বিক্রির দায়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্ত বলেন, তিনি একজন আমদানিকারক। অথচ কোনো ক্রয়-বিক্রয় রসিদ সংরক্ষণ করেননি। এজন্য উনাকে জরিমানা করা হয়েছে। রমজান সামনে রেখে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে অতিরিক্ত লাভ করতে না পারে বা বাজারে কোনো পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে। আমরা আরও অভিযান পরিচালনা করব।

অভিযানে মূল্য তালিকা ও ক্রয়-বিক্রয় রসিদ না রাখার অভিযোগে খাতুনগঞ্জের মদিনা ট্রেডার্সকে ১০ হাজার, আজমির ভান্ডারকে ৩ হাজার এবং ফারুক ট্রেডার্সকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এরপর সরাসরি ডিও/এসও বিক্রির দায়ে ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজকে ১০ হাজার এবং দ্বীন অ্যান্ড কোম্পানিকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এদিকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয় পেঁয়াজ, রসুন, দারুচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল, জয়ত্রী, এলাচ, ধনিয়া, জিরা, আদা, হলুদসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ৩০ হাজার ৭১৭ টনের বেশি মসলা। ২০২২ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয় ১ লাখ ৫১ হাজার ৯৩৩ টন মসলা। গত বছর আমদানি হয় ১ লাখ ৮২ হাজার ৬৫০ টন। মসলা আমদানির মাধ্যমে ২০২২ সালে ৪৫৩ কোটি ৪৮ লাখ ১৬ হাজার ৮০৯ টাকা রাজস্ব আয় করে কাস্টমস। গত বছর আয় হয় ৬৬৩ কোটি ৭৯ লাখ ৪৫ হাজার ৮০৬ টাকা।

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই আমদানি হয়েছে ২ হাজার ৪১৯ মেট্রিক টন এলাচ। শুধু ডিসেম্বর মাসেই এসেছে ৮২ মেট্রিক টন এলাচ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এলাচ এসেছে ৪ হাজার ৮৪৪ মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছে ৩ হাজার ৯০৬ মেট্রিক টন।

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই আমদানি হয়েছে ৪ হাজার ৪৭০ মেট্রিক টন দারুচিনি। শুধু ডিসেম্বরই এসেছে ৬৯৮ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছে ১৫ হাজার ৭৫২ মেট্রিক টন দারুচিনি। ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছে ১০ হাজার ৮১৫ মেট্রিক টন দারুচিনি।

গত ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ৩৩ মেট্রিক টন লবঙ্গ। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই আমদানি হয়েছে ৪২২ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসেছে ১ হাজার ২৭৫ মেট্রিক টন লবঙ্গ। আগের অর্থবছরে এসেছে ১ হাজার ৯৬২ মেট্রিক টন।

অন্যদিকে চাহিদার পাশাপাশি জিরার আমদানিও বেড়েছে। শুধু ডিসেম্বরই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ৪ হাজার ৭৪১ মেট্রিক টন জিরা। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসেই আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ৩০ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসেছে ৩ হাজার ৬৬৯ মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছে ১৮ হাজার ১০৬ মেট্রিক টন জিরা।

খাতুনগঞ্জের মেসার্স রহমান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মসলাপণ্যের বুকিং দর, জ্বালানি খরচ ও পরিবহন খরচ বাড়লেও এ বাড়তি দরের আওতায় আমদানি করা মসলা এখনো দেশে পৌঁছায়নি। বড় আমদানিকারকরা আগেই কম দামে মসলাপণ্য আমদানি করে মজুদ করে রেখেছিলেন। এখন বাড়তি দামের সুযোগে তারা আগের আমদানি করা এসব মসলা বাজারে ছাড়ছেন। ফলে ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের পকেটে বাড়তি লাভ ঢুকছে। কিছুদিনের মধ্যে বাড়তি বুকিং দরে আমদানি করা মসলা বাজারজাত শুরু হলে পণ্যগুলোর দাম আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।

/শিল্পী/