ঢাকা ১১:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪

এক বছরে এইডস শনাক্ত ৭১ মৃত্যু ২৫

সমকামীতায় বাড়ছে এইডসের ভয়াবহতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৪:৫০:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৩ ২২৩ বার পড়া হয়েছে

বিশ্ব এইডস দিবস

নিউজ ফর জাস্টিস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশে চলতি বছরে নতুন করে এইডসে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২৫০ জন। অর্থাৎ দিনে অন্তত­­­ তিন জন করে এইডস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম হলেও মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। এর কারণ এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকেই ঘৃণার চোখে দেখে বলে আক্রান্ত ব্যক্তি রোগের কথা গোপন রাখে। ফলে সহজে রোগ ছড়ায়।

জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসকের বক্তব্যে জানা যায়, তরুণ সমকামীদের মধ্যে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।

সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রচার চালানো হচ্ছে না। ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এইডস বা অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম। রোগটি মানব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ফলে যেকোনো রোগই রোগীকে সহজে কাবু করে ফেলে।

এছাড়া আজও রোগীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ কোনো হাসপাতাল হয়নি। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার সুব্যবস্থাও রাখা হয়নি। এতে রোগীরা রোগ গোপন করে চিকিৎসা নিচ্ছে। অনেককে সাধারণ অসুখেও মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সচেতনতার লক্ষ্যে আজ শুক্রবার সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব এইডস দিবস’। দিবসটির এবারের প্রতিপ্রাদ্য ‘কমিউনিটির আমন্ত্রণ, এইডস হবে নিয়ন্ত্রণ’।

জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্যে জানা যায়, এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে এইডস শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৭ জনের। এর মধ্যে মারা গেছেন ১২০ জন। আর নিয়মিত এইডস রোগীদের জন্য চিকিৎসা এআরটি নিচ্ছেন ৭৮১ জন।

২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নতুন করে হাসপাতালটিতে এইডস টেস্ট করা হয়েছে এক হাজার ৫৪২ জনের। এদের মধ্যে এইডস শনাক্ত হয়েছে ১৫৪ জনের। এটি ২০২২ সালের তুলনায় ৪৯ জন বেশি। ২০২২ সালে এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১০৫ জন। ২০২৩ সালের এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৩ জন এইডস রোগী।

চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত রোগীর শরীর থেকে এইডস নির্মূল করা যায় না। তবে নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসায় রোগীরা দীর্ঘদিন এইডস থাকা অবস্থাতেও বাঁচতে পারেন। দেশে প্রাবাসী, সমকামী ও শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইডস আক্রান্তের হার বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০২২ সাল পর্যন্ত এইডসে মারা গেছেন ১ হাজার ৮২০ জন। এ বছর আরও শতাধিক রোগীর মৃত্যু হয়েছে এইডসে। ২০২২ সালে দেশে এইডসে মৃত্যু হয়েছিল ২৩২ জনের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এইচআইভি সংক্রমণের এখনো কোনো প্রতিকার নেই। তবে কার্যকর এইচআইভি প্রতিরোধ, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে রোগাক্রান্তদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্যমতে, চলতি বছরে শনাক্ত রোগীদের মধ্যে বিদেশ ফেরত ১০২ জন বা ৬৬ শতাংশ রোগী। ২২ শতাংশ সমকামী। ২০ জন বা ১৩ শতাংশের যক্ষা পজিটিভ। ৬ শতাংশ মাদকসেবী ও ৬ শতাংশ শিশু। এসব শিশু রোগীর সবাই গর্ভাবস্থায় মা থেকে আক্রান্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ২০২২ সালের তথ্যমতে, দেশে অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ১৪ হাজার ৫১৩। এরমধ্যে ৩৩ শতাংশ এখনো শনাক্তের বাইরে। যারা শনাক্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ চিকিৎসার আওতায় আছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, খুলনায় এইডসের । দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা জেলায় এইডস সংক্রমণ বেড়েই চলেছে, যা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যদিও এইডস প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নানান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

গত অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে অ্যান্টি রেক্ট্রোভাইরাল থেরাপি (এরআরটি) সেন্টারে শিশুসহ ৭১ জনের নমুনায় এইচআইভি সংক্রমণ বা এইডস শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে এই জীবাণু বহনকারী শিশুসহ ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিভাগের মধ্যে শনাক্ত ও মৃত্যুতে শীর্ষ রয়েছে খুলনা জেলা। আগের বছর খুলনা বিভাগে এইডস শনাক্ত হয়েছিল শিশুসহ ৬৫ জনের। মৃত্যু হয়েছিল শিশুসহ ১৮ জনের। ওই সময়ে খুলনা জেলায় দুই শিশুসহ শনাক্ত হয় ২৮ জন এবং মৃত্যু হয় শিশুসহ ৮ জনের।

এই পরিসংখ্যানই বলছে, খুলনাঞ্চলে দিনে দিন বাড়ছে এইডসের শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বাদ পড়ছে না শিশুরাও।

খুমেকের এআরটি সেন্টার থেকে জানা গেছে, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই সেন্টারে শিশুসহ এক হাজার ২০২ জনের রক্ত পরীক্ষা হয়, যার মধ্যে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে শিশুসহ ৭১ জনের। এদের মধ্যে পুরুষ ৪৬ জন এবং নারী ২৩ জন। এর মধ্যে শিশু (পুরুষ) দুজন এবং শিশু (নারী) আছে ৩ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের আছেন দুজন।

এই সেন্টারে ভাইরাসটি যাদের শনাক্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে খুলনার বাসিন্দা ৩৫ জন, বাগেরহাটের ১১ জন, নড়াইলের ৭ জন, যশোরের ৯ জন, সাতক্ষীরার ৩, গোপালগঞ্জের ২ এবং বরগুনা, বরিশাল, ঝিনাইদহ ও নারায়ণগঞ্জের একজন করে রয়েছেন।

এ সময়ের মধ্যে মোট ২৫ জনের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে খুলনার বাসিন্দা ৮ জন, সাতক্ষীরার ২ জন, যশোরের ৭ জন, নড়াইলের ৩ জন, বাগেরহাটের ৩ জন, মেহেরপুরের ১ জন এবং রাজশাহীর ১ জন রয়েছেন। মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে পুরুষ ১৬ জন এবং নারী আছে ৯ জন। এর মধ্যে ১০ বছরের শিশুও (পুরুষ) রয়েছে। সে ছিল যশোরের বাসিন্দা।

খুমেক হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৯২৩ জনের এইডস পরীক্ষা করা হয়। এদের মধ্যে তিন শিশুসহ ৬৫ জনের এইডস শনাক্ত করা হয়। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ৩৩ জন এবং নারী ৩২ জন ছিলেন। এই সময়ে মৃত্যু হয় ১৮ জনের।

জানা যায়, গত অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে খুমেক হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে নতুন করে ১১৬ জনকে এইচআইভি/এইডস চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। যার মধ্যে খুমেকের এআরটি থেকে শনাক্ত হয় ৭১ জন। বাকি ৪৫ জনকে বিভিন্ন জেলার এনজিও ও সরকারি হাসপাতাল থেকে রেফার্ড করা হয়। এর মধ্যে বিএসএমএমইউ এআরটি সেন্টার থেকে তিনজন, ঢাকার সংক্রামকব্যাধি হাসপাতাল থেকে ২ জন, সিরাজগঞ্জ এআরটি থেকে ১ জন, যশোর এরআরটি থেকে ১৫ জন, সিলেট এআরটি থেকে ১ জন, ডিএএম (এমএসএম) এনজিও অফিস থেকে ১০ জন এবং আশার আলো সোসাইটি (এএএস) এনজিও অফিস থেকে ১৩ জন এসেছেন।

নতুন সেবাপ্রাপ্ত রোগীদের মধ্যে সাধারণ জনগোষ্ঠীর ৪০ জন, সমকামী ৪৪ জন, যৌনকর্মী ৫ জন, যক্ষা রোগী ১০ জন, যৌনকর্মী (পার্টনার) তিনজন, হিজড়া ৩ জন, বিদেশে অবস্থান (আসা যাওয়া) ৫ জন, এইডস পার্টনার ২ জন ও সমকামী পার্টনার ১০ জন রয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার (মেডিসিন) ও এআরটি সেন্টারের ফোকাল পার্সন ডা. দীপ কুমার দাশ বলেন, এই হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের জন্য ‘প্রিভেনশন মাদার টু চাইল্ড ট্রান্সমিশন’ (পিএমসিটি) নামে একটি প্রোগ্রাম চালু আছে। এই প্রোগ্রামে এইচআইভি/এইডস পজিটিভ নারীর গর্ভের সন্তনটি যেন এইচআইভি নেগেটিভ হয়, সে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ সেন্টার থেকে সব পর্যায়ে মানুষের জন্য বিনামূল্যে এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। একইসঙ্গে এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের সব ধরনের পরীক্ষা এবং ১৫-১৬ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াও একাধিক কারণে এইচআইভি পজিটিভ হতে পারে। এইডসের জন্য দায়ী ‘হিউম্যান ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস’ (এইচআইভি) নামের রেট্রোভাইরাসটি। মানুষের রক্ত ও অন্যান্য দেহ রসেই একমাত্র বেঁচে থাকে এই ভাইরাস। এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এমনকি সর্দি-কাশিকেও আটকাতে পারে না শরীর।

খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (সিএস) ডা. শেখ সাদিয়া মনোয়ারা উষা বলেন, এইডস থেকে বাঁচতে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে দূরে থাকতে হবে। যৌনরোগ বা প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে। অনিরাপদ যৌনতায় কনডম ব্যবহার খুবই জরুরি। একবার ব্যবহৃত সিরিঞ্জ বা নিডল পুনরায় ব্যবহার না করা, শরীরে রক্ত বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহণের প্রয়োজন হলে, কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস করার পূর্বে রুটিনলি এইচআইভি টেস্ট করা, এইচআইভি আক্রান্ত মাকে থেরাপির আওতায় আনতে হবে। বিপুল জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে একমাত্র জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই এইডস রোগীরা ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন। জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এইডস শনাক্ত করার জন্য সারাদেশে ২৭টি কেন্দ্র রয়েছে। চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় ১১টি কেন্দ্র থেকে। যা শুধু প্রাথমিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. আরিফুল বাশার বলেন, দেশে একমাত্র সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এইচআইভি রোগীগুলো জটিল পরিস্থিতি নিয়ে ভর্তি হতে পারে। এছাড়া আর কোনো হাসপাতাল নেই। এ হাসপাতালেরও রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। যেমন এইডস রোগীরা সাধারণত খুব সহজেই অন্য রোগে আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে যারা কিডনি, হৃদরোগসহ অন্যান্য জটিল রোগে ভুগছেন তাদের জন্য কার্ডিয়াক সেবাসহ অন্যান্য সেবা প্রয়োজন। তবে এ হাসপাতালে সেসব ব্যবস্থা নেই।

হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে দায়িত্বরত ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার (গাইনি অ্যান্ড অবস) ডা. হাসিবা মুনতাহা বলেন, যেসব বাচ্চা এইচআইভি পজিটিভ তারা জন্মগতভাবে এ রোগ পেয়েছে। আর তরুণদের মধ্যে একটি গ্রুপ সমকামী। এদের অনেকেরই ছোটবেলায় যৌন নির্যাতনের ইতিহাস থাকে। এরা যখন আমাদের কাছে আসে তখন তারা নিজেরাই হ্যাবিচুয়াল সমকামী।

বাংলাদেশে ট্রানজেন্ডার ও সেক্স ওয়ার্কারদের নিয়ে যেভাবে কাজ হয়েছে সমকামী নিয়ে সেভাবে কাজ হয়নি। এ জায়গায় আমাদের এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে জানিয়ে ডা. হাসিবা মুনতাহা বলেন, এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে পরিচিত হচ্ছে, পার্টনার খুঁজছে। এতে একেবারে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করছে। অনেকে সংক্রমিত হচ্ছে।

আরকে/০১

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

এক বছরে এইডস শনাক্ত ৭১ মৃত্যু ২৫

সমকামীতায় বাড়ছে এইডসের ভয়াবহতা

আপডেট সময় : ০৪:৫০:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৩

দেশে চলতি বছরে নতুন করে এইডসে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২৫০ জন। অর্থাৎ দিনে অন্তত­­­ তিন জন করে এইডস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম হলেও মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। এর কারণ এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকেই ঘৃণার চোখে দেখে বলে আক্রান্ত ব্যক্তি রোগের কথা গোপন রাখে। ফলে সহজে রোগ ছড়ায়।

জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসকের বক্তব্যে জানা যায়, তরুণ সমকামীদের মধ্যে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।

সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রচার চালানো হচ্ছে না। ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এইডস বা অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম। রোগটি মানব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ফলে যেকোনো রোগই রোগীকে সহজে কাবু করে ফেলে।

এছাড়া আজও রোগীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ কোনো হাসপাতাল হয়নি। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার সুব্যবস্থাও রাখা হয়নি। এতে রোগীরা রোগ গোপন করে চিকিৎসা নিচ্ছে। অনেককে সাধারণ অসুখেও মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সচেতনতার লক্ষ্যে আজ শুক্রবার সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব এইডস দিবস’। দিবসটির এবারের প্রতিপ্রাদ্য ‘কমিউনিটির আমন্ত্রণ, এইডস হবে নিয়ন্ত্রণ’।

জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্যে জানা যায়, এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে এইডস শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৭ জনের। এর মধ্যে মারা গেছেন ১২০ জন। আর নিয়মিত এইডস রোগীদের জন্য চিকিৎসা এআরটি নিচ্ছেন ৭৮১ জন।

২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নতুন করে হাসপাতালটিতে এইডস টেস্ট করা হয়েছে এক হাজার ৫৪২ জনের। এদের মধ্যে এইডস শনাক্ত হয়েছে ১৫৪ জনের। এটি ২০২২ সালের তুলনায় ৪৯ জন বেশি। ২০২২ সালে এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১০৫ জন। ২০২৩ সালের এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৩ জন এইডস রোগী।

চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত রোগীর শরীর থেকে এইডস নির্মূল করা যায় না। তবে নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসায় রোগীরা দীর্ঘদিন এইডস থাকা অবস্থাতেও বাঁচতে পারেন। দেশে প্রাবাসী, সমকামী ও শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইডস আক্রান্তের হার বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০২২ সাল পর্যন্ত এইডসে মারা গেছেন ১ হাজার ৮২০ জন। এ বছর আরও শতাধিক রোগীর মৃত্যু হয়েছে এইডসে। ২০২২ সালে দেশে এইডসে মৃত্যু হয়েছিল ২৩২ জনের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এইচআইভি সংক্রমণের এখনো কোনো প্রতিকার নেই। তবে কার্যকর এইচআইভি প্রতিরোধ, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে রোগাক্রান্তদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্যমতে, চলতি বছরে শনাক্ত রোগীদের মধ্যে বিদেশ ফেরত ১০২ জন বা ৬৬ শতাংশ রোগী। ২২ শতাংশ সমকামী। ২০ জন বা ১৩ শতাংশের যক্ষা পজিটিভ। ৬ শতাংশ মাদকসেবী ও ৬ শতাংশ শিশু। এসব শিশু রোগীর সবাই গর্ভাবস্থায় মা থেকে আক্রান্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ২০২২ সালের তথ্যমতে, দেশে অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ১৪ হাজার ৫১৩। এরমধ্যে ৩৩ শতাংশ এখনো শনাক্তের বাইরে। যারা শনাক্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ চিকিৎসার আওতায় আছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, খুলনায় এইডসের । দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা জেলায় এইডস সংক্রমণ বেড়েই চলেছে, যা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যদিও এইডস প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নানান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

গত অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে অ্যান্টি রেক্ট্রোভাইরাল থেরাপি (এরআরটি) সেন্টারে শিশুসহ ৭১ জনের নমুনায় এইচআইভি সংক্রমণ বা এইডস শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে এই জীবাণু বহনকারী শিশুসহ ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিভাগের মধ্যে শনাক্ত ও মৃত্যুতে শীর্ষ রয়েছে খুলনা জেলা। আগের বছর খুলনা বিভাগে এইডস শনাক্ত হয়েছিল শিশুসহ ৬৫ জনের। মৃত্যু হয়েছিল শিশুসহ ১৮ জনের। ওই সময়ে খুলনা জেলায় দুই শিশুসহ শনাক্ত হয় ২৮ জন এবং মৃত্যু হয় শিশুসহ ৮ জনের।

এই পরিসংখ্যানই বলছে, খুলনাঞ্চলে দিনে দিন বাড়ছে এইডসের শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বাদ পড়ছে না শিশুরাও।

খুমেকের এআরটি সেন্টার থেকে জানা গেছে, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই সেন্টারে শিশুসহ এক হাজার ২০২ জনের রক্ত পরীক্ষা হয়, যার মধ্যে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে শিশুসহ ৭১ জনের। এদের মধ্যে পুরুষ ৪৬ জন এবং নারী ২৩ জন। এর মধ্যে শিশু (পুরুষ) দুজন এবং শিশু (নারী) আছে ৩ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের আছেন দুজন।

এই সেন্টারে ভাইরাসটি যাদের শনাক্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে খুলনার বাসিন্দা ৩৫ জন, বাগেরহাটের ১১ জন, নড়াইলের ৭ জন, যশোরের ৯ জন, সাতক্ষীরার ৩, গোপালগঞ্জের ২ এবং বরগুনা, বরিশাল, ঝিনাইদহ ও নারায়ণগঞ্জের একজন করে রয়েছেন।

এ সময়ের মধ্যে মোট ২৫ জনের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে খুলনার বাসিন্দা ৮ জন, সাতক্ষীরার ২ জন, যশোরের ৭ জন, নড়াইলের ৩ জন, বাগেরহাটের ৩ জন, মেহেরপুরের ১ জন এবং রাজশাহীর ১ জন রয়েছেন। মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে পুরুষ ১৬ জন এবং নারী আছে ৯ জন। এর মধ্যে ১০ বছরের শিশুও (পুরুষ) রয়েছে। সে ছিল যশোরের বাসিন্দা।

খুমেক হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৯২৩ জনের এইডস পরীক্ষা করা হয়। এদের মধ্যে তিন শিশুসহ ৬৫ জনের এইডস শনাক্ত করা হয়। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ৩৩ জন এবং নারী ৩২ জন ছিলেন। এই সময়ে মৃত্যু হয় ১৮ জনের।

জানা যায়, গত অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে খুমেক হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে নতুন করে ১১৬ জনকে এইচআইভি/এইডস চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। যার মধ্যে খুমেকের এআরটি থেকে শনাক্ত হয় ৭১ জন। বাকি ৪৫ জনকে বিভিন্ন জেলার এনজিও ও সরকারি হাসপাতাল থেকে রেফার্ড করা হয়। এর মধ্যে বিএসএমএমইউ এআরটি সেন্টার থেকে তিনজন, ঢাকার সংক্রামকব্যাধি হাসপাতাল থেকে ২ জন, সিরাজগঞ্জ এআরটি থেকে ১ জন, যশোর এরআরটি থেকে ১৫ জন, সিলেট এআরটি থেকে ১ জন, ডিএএম (এমএসএম) এনজিও অফিস থেকে ১০ জন এবং আশার আলো সোসাইটি (এএএস) এনজিও অফিস থেকে ১৩ জন এসেছেন।

নতুন সেবাপ্রাপ্ত রোগীদের মধ্যে সাধারণ জনগোষ্ঠীর ৪০ জন, সমকামী ৪৪ জন, যৌনকর্মী ৫ জন, যক্ষা রোগী ১০ জন, যৌনকর্মী (পার্টনার) তিনজন, হিজড়া ৩ জন, বিদেশে অবস্থান (আসা যাওয়া) ৫ জন, এইডস পার্টনার ২ জন ও সমকামী পার্টনার ১০ জন রয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার (মেডিসিন) ও এআরটি সেন্টারের ফোকাল পার্সন ডা. দীপ কুমার দাশ বলেন, এই হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের জন্য ‘প্রিভেনশন মাদার টু চাইল্ড ট্রান্সমিশন’ (পিএমসিটি) নামে একটি প্রোগ্রাম চালু আছে। এই প্রোগ্রামে এইচআইভি/এইডস পজিটিভ নারীর গর্ভের সন্তনটি যেন এইচআইভি নেগেটিভ হয়, সে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ সেন্টার থেকে সব পর্যায়ে মানুষের জন্য বিনামূল্যে এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। একইসঙ্গে এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের সব ধরনের পরীক্ষা এবং ১৫-১৬ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াও একাধিক কারণে এইচআইভি পজিটিভ হতে পারে। এইডসের জন্য দায়ী ‘হিউম্যান ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস’ (এইচআইভি) নামের রেট্রোভাইরাসটি। মানুষের রক্ত ও অন্যান্য দেহ রসেই একমাত্র বেঁচে থাকে এই ভাইরাস। এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এমনকি সর্দি-কাশিকেও আটকাতে পারে না শরীর।

খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (সিএস) ডা. শেখ সাদিয়া মনোয়ারা উষা বলেন, এইডস থেকে বাঁচতে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে দূরে থাকতে হবে। যৌনরোগ বা প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে। অনিরাপদ যৌনতায় কনডম ব্যবহার খুবই জরুরি। একবার ব্যবহৃত সিরিঞ্জ বা নিডল পুনরায় ব্যবহার না করা, শরীরে রক্ত বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহণের প্রয়োজন হলে, কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস করার পূর্বে রুটিনলি এইচআইভি টেস্ট করা, এইচআইভি আক্রান্ত মাকে থেরাপির আওতায় আনতে হবে। বিপুল জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে একমাত্র জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই এইডস রোগীরা ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন। জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এইডস শনাক্ত করার জন্য সারাদেশে ২৭টি কেন্দ্র রয়েছে। চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় ১১টি কেন্দ্র থেকে। যা শুধু প্রাথমিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. আরিফুল বাশার বলেন, দেশে একমাত্র সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এইচআইভি রোগীগুলো জটিল পরিস্থিতি নিয়ে ভর্তি হতে পারে। এছাড়া আর কোনো হাসপাতাল নেই। এ হাসপাতালেরও রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। যেমন এইডস রোগীরা সাধারণত খুব সহজেই অন্য রোগে আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে যারা কিডনি, হৃদরোগসহ অন্যান্য জটিল রোগে ভুগছেন তাদের জন্য কার্ডিয়াক সেবাসহ অন্যান্য সেবা প্রয়োজন। তবে এ হাসপাতালে সেসব ব্যবস্থা নেই।

হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে দায়িত্বরত ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার (গাইনি অ্যান্ড অবস) ডা. হাসিবা মুনতাহা বলেন, যেসব বাচ্চা এইচআইভি পজিটিভ তারা জন্মগতভাবে এ রোগ পেয়েছে। আর তরুণদের মধ্যে একটি গ্রুপ সমকামী। এদের অনেকেরই ছোটবেলায় যৌন নির্যাতনের ইতিহাস থাকে। এরা যখন আমাদের কাছে আসে তখন তারা নিজেরাই হ্যাবিচুয়াল সমকামী।

বাংলাদেশে ট্রানজেন্ডার ও সেক্স ওয়ার্কারদের নিয়ে যেভাবে কাজ হয়েছে সমকামী নিয়ে সেভাবে কাজ হয়নি। এ জায়গায় আমাদের এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে জানিয়ে ডা. হাসিবা মুনতাহা বলেন, এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে পরিচিত হচ্ছে, পার্টনার খুঁজছে। এতে একেবারে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করছে। অনেকে সংক্রমিত হচ্ছে।

আরকে/০১