ঢাকা ০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪

বিশেষ প্রতিবেদন।। নারী যখন অনুপ্রেরণা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৫৮:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ মার্চ ২০২৩ ১২১ বার পড়া হয়েছে
নিউজ ফর জাস্টিস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পরিবারের চৌহদ্দী থেকে বেড়িয়েছে অনেক আগেই। তবে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যেতে হয়েছে। লড়াই কিন্তু এখন চলছে। সেই লড়াইয়ে জীবনের নতুন গল্প যোগ হয়েছে । যেখানে সফলতা অনুপ্রেরণা যুগিয়ে চলছে অন্যদের। আজ আর্ন্তজাতিক নারী দিবসে নিউজ ফর জাস্টিস তেমনি কিছু মানুষের গল্প তুলে ধরছে এই বিশেষ আয়োজনে…

 

শাহিন বাবু

 

সময় স্বপ্ন ছিল সরকারি চাকরি করবেন কিংবা আইনজীবী হবেন। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে লেখাপড়া শেষ করে অবশ্য সে পথে আর হাঁটেননি শায়লা আখন্দ। বরং দেশীয় ঐতিহ্য ধরে রেখে গ্রামীণ ঐতিহ্যের খাবারগুলো নতুন করে জনপ্রিয় করতে উদ্যোক্তা হয়ে উঠলেন। ২০০৯ সালে তার উদ্যোক্তা জীবনের শুরু।

ঐতিহ্যবাহী সব দেশীয় খাবার যেমন মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া, নিমকি, মুরালি, মনেক্কা, শাহি খুরমা, বাদাম পাপড়ি, বাদাম টানা, তিল পাপড়ি, তিল টানা, নারকেল নাড়ু, তিল নাড়ু, নানারকম পিঠা, শবে-বরাতের হালুয়া, প্যাকেটজাত মশলা পাওয়া যায় তার উদ্যোগ ‘সতেজ’-এ। আছে বিভিন্ন রকমের বৈশাখী গিফট আইটেম।

শায়লা আখন্দ

 

উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সেরকম কারো সহযোগিতা বা সমর্থন পাননি। “পেছনের অনেক গল্প আছে, আশেপাশের মানুষ ও পরিবারে মানুষদের আমার পাশে না থাকা, এটা ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। পরে বুঝাতে সক্ষম হলাম যে আমি কিছু করতে পারবো ও একজন ভাল উদ্যোক্তাও হতে পারব,” এভাবে নিজের সফলতার কথা উদ্যোক্তা বার্তাকে জানান শায়লা আখন্দ। শুরুতে পরিবারের অন্যদের সহায়তা না পেলেও তার উদ্যোক্তা জীবনের শুরু থেকে বড়  অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন তার হাসব্যান্ড।

শায়লার কর্মভুবনে এখন ৩০ -৩৫ জন কর্মী আছেন। অনলাইনে তার পেইজ ‘সতেজ ফুড’। পণ্য যাচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ড শপে, যার মধ্যে আছে স্বপ্ন, মীনা বাজার,  সি. এস.  ডি, প্রাণ ডেইলি শপিং, বেস্ট বাই, ট্রাস্ট ফ্যামিলি নিডস্, ইউনিমার্ট এবং লাজ ফার্মা। খুচরা বাজারেও যাচ্ছে তার পণ্য।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় তিনি জানান, “আমি চাই দেশীয় ঐতিহ্য যেনো হারিয়ে না যায়। সেসঙ্গে বিদেশেও আমাদের পণ্যের প্রসার ও পরিচিতি করাতে চাই।”

 

 একজন সফল নারী উদ্যোক্তা তানিয়া

 

নিজের ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আজকের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে বহুদূর। তেমনি ভাবে একজন সফল গৃহিণীর পরিচয়ের পাশাপাশি একজন সফল উদ্যোক্তার পরিচয় গড়ে তুলেছেন তানিয়া চৌধুরী । তিনি বলেন,

তানিয়া চৌধুরী

 

“আমি  আমি একজন গৃহিনী। বর্তমানে পড়াশোনা করছি মাস্টার্স, বাংলা সাহিত্য নিয়ে লালমাটিয়া সরকারি মহিলা কলেজ থেকে। পড়াশোনার পাশাপাশি আমার ছোট একটি অনলাইন বিজনেস রয়েছে। যেখানে আমি সাধারণত হোমমেড ফুড ও কেক তৈরি করে সেল করে থাকি। নারীরা আজ আত্মনির্ভরশীল। আর সেইটা প্রমাণ করার জন্যই আমার এই ছোট উদ্যোগ। শুধুমাত্র একজন সফল গৃহিণী ও মা হিসেবে নয় পাশাপাশি নিজেকে দেখতে চেয়েছি একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে।

খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় আমার। সেই সঙ্গে খুব তাড়াতাড়িই প্রথম বেবি কনসিভ করি। অল্প বয়সেই সংসারের সব কিছু গুছিয়ে নিয়েছিলাম খুব সহজেই। কিন্তু ঘর সামলানোর পাশাপাশি নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলতে চেয়েছিলাম সবসময়। যেহেতু ঘর আর ছোট বাচ্চা সামলানোর পাশাপাশি বাহিরে গিয়ে কিছু করা আমার পক্ষে তেমন সম্ভব হচ্ছিলো না তাই চিন্তা করে ঘরে বসেই কিছু করার।

আমি নানান রকম মজাদার রান্না করতে বেশ পছন্দ করি। এছাড়া আমার মেয়ে আনিশা কেক খেতে বেশ পছন্দ করে। তাই হরেক রকমের কেকও বানাতাম ঘরের সবার জন্য। এবং আমার কেক খেতে সবাই খুব পছন্দ করতেন এবং প্রশংসাও করতেন। সে থেকেই মাথায় আসলো আমি আমার রান্নার স্কিলকে কাজে লাগিয়ে একটি অনলাইন হোমমেড ফুড সার্ভিস খুলতে পারি। এর ফলে যারা বাহিরের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পছন্দ করেন না এবং হোমমেড স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খুঁজে থাকেন তাদের জন্যও উপকারী এবং আমার জন্য বেশ সহজ ও আনন্দময়ী একটি কাজ হবে।

স্বাবলম্বী হওয়ার সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে শুরু করি আমার একটু একটু করে পথচলা। Anishas Homemade Foods and Cake Shop নামক একটি অনলাইন পেজ খুলার মাধ্যমেই আমার বিজনেস এর প্রথম যাত্রা শুরু হয়। পেইজ খোলার পর আমার রান্নার ও কেক এর নানান রকম ছবি আমি শেয়ার করতে থাকি। কিছুদিন পরেই আমার অর্ডার চলে আসতে থাকে। এতো স্বল্প সময়ে যে এতো সারা পাবো আমি কখনো ভেবে উঠতে পারিনি। আমার প্রথম কাস্টমার ছিলেন আমারই প্রতিবেশী এক ভাবী।

আমার এই কাজে আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রানিত করেছে আমার পরিবার। তারা আমাকে উৎসাহ দেয় আমার কাজ কে এগিয়ে নেয়ার জন্য। বিজনেস শুরু করার আগে তাদের উৎসাহে আমি ছোট একটি কেক বানানোর উপর কোর্স ও করে থাকি। তারা আমার পাশে না থাকলে আমি সাহস পেতাম না এতো দূর এগিয়ে যাওয়ার।

সবাই যেহেতু আমার পাশে ছিল তাই আলহামদুলিল্লাহ বিজনেসে আমার তেমন কোন বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়নি। সব বেশ ভালো যাচ্ছিলো। কিন্তু কিছুদিন পরই আমি দ্বিতীয় বার কন্সিভ করি। এতে একটু কষ্ট হলেও আমি থেকে থাকিনি। 6 মাসের প্রেগনেনসি নিয়ে প্রচুর কাজ করেছি আলহামদুলিল্লাহ । আমার স্বামী সবসময় আমার পাশে ছিলেন । আমাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছিলেন সেইসময়। তাই আমাকে আর পিছিয়ে পরতে হয়নি। সবচেয়ে বেশি পাশে ছিল আমার ননদ জলি। ও বাবু দের না দেখলে এতো সুন্দর ভাবে সব কিছু সামলানো অনেক কষ্ট সাধ্য ছিল।

আব্বু-আম্মুর দোয়া ও আমার কাস্টমারদের সাপোর্ট ,ভালোবাসায় এখন আমি স্বাবলম্বী। এখন আমি আমার অনলাইন বিজনেস এর পাশাপাশি নিজেই বেকিং বিষয় নিয়ে কোর্স করিয়ে থাকি। যা আবার বিজনেসের পাশাপাশি আরও একটি নতুন উদ্যোগ। আলহামদুলিল্লাহ্‌ এখন আমি একজন সফল উদ্যোক্তা। এখন আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একটাই আমার এই হোমমেড ফুড বিজনেজ-এর সঙ্গে আমার এই নতুন উদ্যোগটিকে অনেক দূর নিয়ে যাওয়া। শেখার কোন শেষ নেই, তাই শিখতে চাই আরও অনেক কিছু ।

 

সুইজারল্যান্ড, ইতালিসহ আট দেশে যায় মাকসুদার পণ্য

 

নিজের জমানো অর্থ ও গহনা বিক্রির টাকা দিয়ে ২০১৬ সালে ব্যবসা শুরু করেন ঢাকার মেয়ে মাকসুদা খাতুন। তার ‘শাবাব লেদার’ নামের প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথমে পাঁচজন শ্রমিক থাকলেও বর্তমানে কাজ করছেন অর্ধশতাধিক শ্রমিক। শুরুতে দুটি মডেলের চামড়ার লং জেন্টস ওয়ালেট বানালেও বর্তমানে তার ফ্যাক্টরিতে তৈরি হচ্ছে এক্সিকিউটিভ ব্যাগ, এক্সিকিউটিভ ফাইল, লেডিস ব্যাগ, মেসেঞ্জার ব্যাগ, লেডিস পার্স, ব্যাকপ্যাক, বেল্ট, মাউস প্যাড, চাবির রিং, করপোরেট গিফট আইটেম, পেন হোল্ডার, পেন স্ট্যান্ড, ডায়েরি কভার, জ্যাকেটসহ যাবতীয় চামড়াজাত পণ্য।

যখন শুরু করি তখন চারপাশের মানুষজন বলতে শুরু করে, মেয়েরা আবার ব্যবসা করে নাকি। বড় জোর টিচিং কিংবা ব্যাংকে চাকরি করবে। ফ্যামিলি থেকে বাধা তো ছিলই, পাশাপাশি পুঁজির একটা অভাব ছিল। তবে নিজে কিছু করার একটা জেদ ছিল, তাই হয়তো সব বাধা অতিক্রম করতে পেরেছি

মাকসুদা বলেন, বর্তমানে সুইজারল্যান্ড, ইতালি, গ্রিসসহ আট দেশে আমার পণ্য যায়। নিজেরা তৈরির পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট লাগেজ, কারুপণ্যসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছি। এছাড়া করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে সাপোর্ট দিচ্ছি। করোনা-পরবর্তী সময়ে আমরা অনলাইনে ব্যাপক রেসপন্স পেয়েছি। দারাজ, দেশিবেশিসহ বেশকিছু ই-কমার্স প্লাটফর্মে আমাদের পণ্য পাওয়া যায়। এছাড়া এফ-কমার্সেও আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি।

উচ্চশিক্ষা শেষে শিক্ষকতা পেশায় মনোনিবেশ করেছিলেন মাকসুদা। তবে সবসময়ই নিজে কিছু করার আগ্রহ ছিল তার। মাকসুদার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পাশাপাশি পার্টনারশিপে চামড়াজাত পণ্য রফতানি করছিলেন। এক পর্যায়ে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে স্বামীর ব্যবসার হাল ধরেন মাকসুদা। নানা জটিলতায় লোকসান হতে থাকায় বন্ধ হয়ে যায় স্বামীর ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সেই সময় প্রায় ৭০ লাখ টাকা ঋণের বোঝা মাথায় আসে মাকসুদা দম্পতির। তাতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মাকসুদার স্বামী। নিজে শক্ত থেকে ব্যবসা দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন মাকসুদা। প্রথমে নিজেই বিভিন্ন দোকানে উৎপাদিত পণ্যের বিপণন শুরু করেন।

মাকসুদা বলেন, ঋণের পরিমাণটা এতো ছিল যে; আমি বুঝতে পারি চাকরি করে এটা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তখন ব্যবসাটা মোটামুটি আয়ত্ত করে ফেলেছি। পুরোনো কিছু যন্ত্রপাতি কিনে শুরু করি। বুঝতে পারছিলাম নিজের পরিবারের জন্য কিছু করতে হবে। ঋণ শোধ করতে হবে। তা না হলে দুদিন পরে জেলে যেতে হবে। কেরানীগঞ্জে একটি ফ্ল্যাট, কিছু গহনা বিক্রি ও ডিপিএস ভেঙে কিছু ঋণ শোধ করলাম। প্রায় ১০ লাখ পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। এখন প্রায় ৩০টির মতো শোরুমে আমার পণ্য যাচ্ছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে একটি শোরুম নিয়েছি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফুটওয়্যার বিজনেস শুরু করেছি। এছাড়া বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ‘প্রেসিডেন্ট’-এ আমার পণ্য যাচ্ছে। ব্যাংক-বীমাসহ আটটা করপোরেট প্রতিষ্ঠানে শাবাব লেদার সাপোর্ট দিয়ে থাকে। আরও কয়েকটিতে কথা বলছি।

তিনি বলেন, শুধু পুরুষরাই নারীদের জায়গা করে দেবে, তা নয়। নারীদের নিজের জন্য পরিচয় তৈরি করতে হবে। একইসঙ্গে বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য কাজ করতে হবে। নিজে সৎ থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যে সব বাধাই অতিক্রম করা যায় জানিয়ে তিনি বলেন, সব ধরনের লাইসেন্স, পেপার— সবকিছু আমি দ্রুত করতে পেরেছি। সেসব সমস্যা অন্য সব উদ্যোক্তা ফেইস করেন, আমিও সেসব ঘটনা ফেইস করেছি।

এই উদ্যোক্তা বর্তমানে ওমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর বাংলাদেশ, ওমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর, নতুন প্রজন্ম, চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব, যুব উন্নয়ন অধিদফতর, বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশনসহ বেশকিছু সংস্থার সঙ্গেও কাজ করছেন।

চার হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু শামার

 

০০৩ সালে মাত্র চার হাজার টাকা দিয়ে বুটিক ব্যবসা শুরু করেন শাফিয়া শামা। তখন রাজধানীর বেশকিছু ফ্যাশন হাউসে তৈরি পোশাক সরবরাহ করতেন তিনি। ২০০৮ সালের দিকে পাটপণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। পাটের বহুমুখী পণ্য তৈরির লক্ষ্যে ফ্যাক্টরি করেন হাজারীবাগে। করোনার কারণে সেই ফ্যাক্টরি বর্তমানে বন্ধ হলেও অন্য ফ্যাক্টরিতে চলছে তার পাটপণ্য তৈরির কাজ।

শাফিয়া শামার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘এমএস শামা’। নেদারল্যান্ডসসহ বেশকিছু দেশে রফতানি হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানের পণ্য। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, ব্র্যাক ও এর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, রবি, আইসিডিডিআরবিসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে পাটপণ্য সরবরাহ করে ‘এমএস শামা’। সাফিয়া শামার পণ্যের ব্র্যান্ডের নাম ‘উড়ান’। অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে উড়ানের পণ্য। পাটের প্রশিক্ষণ ব্যাগ, পাটের ফাইল, পর্দা, কুশন কভার, সোফা কভার, কম্বল, পর্দা, টেবিল রানার, টেবিল ম্যাট, কার্পেট, ডোরম্যাট, শতরঞ্জি, শোপিস নিয়ে কাজ করেন শামা। এমনকি পাট দিয়ে তৈরি শাড়ি, ব্লেজার, ফতুয়া, কটিও বিক্রি করেন এই উদ্যোক্তা।

শাফিয়া শামা বলেন, ‘নিজের একটা পরিচয় গড়তে ব্যবসাটা শুরু করি। চাকরি করতে চাইলেও ফ্যামিলি রাজি ছিল না। আমি ছোটবেলা থেকে টিউশনি করতাম। নিজের খরচের টাকাটা নিজেই জোগাড় করতাম। বিয়ে হওয়ার পর যখন বাচ্চা হলো, তখন একটা বিষয় খুব ফিল করতাম। সেটা হলো ছোটখাটো বিষয়ের জন্য আরেকজনের কাছে টাকা চাইতে হয়। সেটা ভালো লাগতো না। তখন বাসায় থেকে ব্যবসাটা শুরু করি।’

তিনি বলেন, আমি রফতানি করি। ব্র্যাকসহ বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে আমার প্রোডাক্ট যাচ্ছে। প্যান্ডেমিকের মধ্যে আমার হাজারীবাগের ফ্যাক্টরিটা বন্ধ করে দিয়েছি। সেখানে প্রায় ৩০ জন কর্মী কাজ করতেন। এখন কিছু অর্ডার আসছে। আশা করছি শিগগিরই ফ্যাক্টরিটা চালু করতে পারবো। ব্যবসা করতে গিয়ে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, যখন শুরু করি তখন চারপাশের মানুষজন বলতে শুরু করে, মেয়েরা আবার ব্যবসা করে নাকি। বড় জোর টিচিং কিংবা ব্যাংকে চাকরি করবে। ফ্যামিলি থেকে বাধা তো ছিলই, পাশাপাশি পুঁজির একটা অভাব ছিল। তবে নিজে কিছু করার একটা জেদ ছিল, তাই হয়তো সব বাধা অতিক্রম করতে পেরেছি। তিনি আরও বলেন, অনলাইনে উড়ান নামে একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি শুরু করেছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে পিছিয়ে গেছি। সেটাকে ফের চাঙ্গা করতে কাজ শুরু করেছি।

বাধা পেরিয়ে সফল উদ্যোক্তা হাসিনা মুক্তা

 

ছোটবেলা থেকেই নিজের পোশাক নিজে তৈরি করার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজে মনোযোগী ছিলেন হাসিনা মুক্তা। ২০০৯ সালে ‘নতুনত্ব বুটিকস ও হস্তশিল্প’ নামে তৈরি পোশাক, ক্রাফটস উৎপাদন ও বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান করেন হাসিনা। একইসঙ্গে নিজ বাড়িতে হস্তশিল্প ট্রেনিং সেন্টার চালু করেন। সেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন।

ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ১৯৯৮ সালে যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে পোশাক তৈরি ও ব্লক-বাটিকের প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৯৯ সালে বিয়ের পর বিভিন্ন সময় যুব উন্নয়ন অধিদফতরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেন। পরে স্বামীর সহযোগিতায় কয়েকটি সেলাই মেশিন ক্রয় করে বুটিকসের কাজ শুরু করেন এই উদ্যোক্তা। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ব্যাগ, ম্যাট, কলমদানি, পাপোস ব্লক-বাটিকসহ নকশীকাঁথা, শাড়ি, বিছানার চাদর, কুশন কভার তৈরি হয় মুক্তার নতুনত্ব বুটিকস ও হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানে।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমি কিছু ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছি। একটা শোরুম আছে, পাশাপাশি আমার কারখানায় প্রায় ৬০ জন কর্মী কাজ করছেন। ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু হলেও বর্তমানে আমার মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ টাকায়। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামীণ নারীদের দিয়ে নকশীকাঁথাসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পের কাজ করছি আমরা। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ হাসিনা মুক্তা ২০১৩ সালে পান নেলসন ম্যান্ডেলা অ্যাওয়ার্ড। সেই বছর নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পান কবি নজরুল সম্মাননা। নারীসেবা ও মানব উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সম্মাননাও পান তিনি। ২০১৪ সালে মহিলা আত্মকর্মসংস্থানকর্মী হিসেবে পান জাতীয় যুব পুরস্কার।

 

অনলাইন ব্যবসায় সফল নারী

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল খুলেই বেশির ভাগ নারী উদ্যোক্তা নিজের হাতে তৈরি করা পণ্য বিক্রি করে সাধারণ গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করছেন। আবার অনেকেই ওয়েবসাইট খুলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছেন ভৈরবসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

নিজেদের আইডিয়া কাজে লাগিয়ে ‘উই (ওমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম)’-এর সদস্য ভৈরবের নারী উদ্যোক্তা শোভা খানমের ‘রমণীর রং’ মিশু আক্তারের ‘দেশি রং দেশি ঢং’ আদ্রৌ জুইয়ের ‘ব্রাইডাল কালেকশন’ নাবিলা রহমানের ‘নাবিলা ক্রাফট অ্যান্ড ক্রিয়েশন’ মেহবুবা ফেরদৌস মিথিলা বিজনেস পেজ ‘আহরিকা, লামিয়া চৈতির ‘গুড ফুড’ ফারজানা আক্তারের ‘মাটির বাহার’ সহ বিভিন্ন নজরকারা নামে বিজনেস পেজে হাতের তৈরি নানা রকমের মশলা, ছাতুসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য, হাতের কাজের গহনা, শাড়ি, থ্রি-পিচ, টু-পিচ, টপস, ব্লাউজ, পাঞ্জাবি, বিচানার চাদর, কোশন কভার, কসমেটিকস, মাটির তৈজসপত্র, অর্গানিক টিউব মেহেদি, আর্টিফিশিয়াল ফ্লাওয়ার ছাড়াও দেশীয় প্রজাতির মাছ ও হাঁস-মুরগির মাংস প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছেন অনলাইনে।

শুধু অনলাইন মাধ্যমকেই কাজে লাগিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যান্য বেকার নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে আর্থিক সচ্ছলতার পথকে সুগম করছেন তারা। অন্যদিকে অনলাইনে অর্ডার করে ঘরে বসেই পণ্য পাওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা অনলাইন ব্যবসাকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। নারী উদ্যোক্তারা জানান, করোনাকালে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের চাকরি হারিয়ে অনেকেই বেকার হয়ে পড়ে। আবার পুরুষরা ছোটখাটো ব্যবসা করে যারা পরিবারের অর্থ জোগান দিত তাদেরও ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক অভাব অনটনে দিন কাটে। আর এসব কারণেই তারা অনলাইনে ব্যবসার চিন্তা করে। ঘরে বেকার বসে না থেকে অল্প পুঁজি খাটিয়ে ফেসবুক পেজ খুলে অনলাইনে নিজেদেরও তৈরি পণ্য বিক্রি শুরু করে। অনলাইনে ক্রেতাদের সাড়া পাওয়ায় তাদের ব্যবসাকে ছোট থেকে মাঝারি ও বড় পরিসরে গড়ে তুলতে পরিশ্রম করছেন তারা। অক্লান্ত পরিশ্রমই আর্থিক সচ্ছলতার মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করছে।

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার লুবনা ফারজানা বলেন, অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচ্ছল জীবনযাপনে সুন্দর পথে এগিয়ে নিবে। করোনা পরিস্থিতিতে অনেকেই নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সফলতা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা পেয়েছে। ভৈরবের বেশির ভাগ অনলাইন উদ্যোক্তাই কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও গৃহিণী। তারা নিজেরাই নিজেদের কর্মের ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। ইতিমধ্যেই ভৈরব উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে অর্ধশত নারী উদ্যোক্তাকে আর্টিফিশিয়াল ফ্লাওয়ার তৈরি বিষয়ক দক্ষতাবৃদ্ধি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয় ও উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। এ ছাড়াও নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক ঋণ সহায়তার ব্যবস্থা করবেন বলে তিনি জানান।

 

নার্সারি করে সফল নারী উদ্যোক্তা, বছরে আয় ৩৫ লাখ

 

নারী উদ্যোক্তা জেসমিন আরা। নিজেকে শুধু গৃহিণী হিসেবে নয়, সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। ময়মনসিংহের পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ঘেঁষা গৌরীপুর উপজেলার কাশিয়ারচর এলাকায় ‘আধুনিক নার্সারি অ্যান্ড হর্টিকালচার ফার্ম’ নামে একটি নার্সারি গড়ে তুলেছেন তিনি। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের অধীনে বৃক্ষরোপণে বিশেষ অবদান রাখায় জেসমিন আরা জাতীয় পুরষ্কার লাভ করেন। জেসমিন আরা নিজের ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে গৃহিণীর পরিচয়ের পাশাপাশি সফল উদ্যোক্তার পরিচয় গড়ে তুলেছেন।

জেসমিন আরা

 

দেখা যায়, জেসমিন আরার নার্সারিতে দেশি-বিদেশি জাতের আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, কমলা, আমড়া, লেবু, জাম্বুরা, লটকনসহ বিভিন্ন জাতের অসংখ্য চারা রয়েছে। শ্রমিকদের পাশে দাড়িয়ে পরিচর্যার কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন জেসমিন। তার নার্সারিতে কাজ করা শ্রমিকরা এখানে কাজ করে তারাও স্বচ্ছল হয়েছেন।

জেসমিন আরা বলেন, আমি পুরোদস্তুর গৃহিনী ছিলাম। কিছু একটা করার প্রবল ইচ্ছা থেকে স্বামী ময়মনসিংহ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বিনা) উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শামছুল আলম মিঠুর পরামর্শ নিয়ে ২০১৯ সালে নার্সারি শুরু করি। ধীরে ধীরে সফলতা পেয়েছি। বর্তমানে ১২ একর জায়গায় ৩০০ প্রজাতির উন্নত মানের ৪ লক্ষাধিক চারা রয়েছে আমার নার্সারিতে। নার্সারিতে নিয়মিত ২১ জনসহ ৩৫ জন শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বছরে ৩৫ লাখ টাকার চারা বিক্রি করতে পারি। আমার নার্সারির চারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতারা এসে নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নারীদের আত্মনির্ভরশীল হতে নিজের ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমের প্রয়োজন। সঠিক পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে কোনো কিছুর উদ্যোগ গ্রহন করলে তাতে সফল হওয়া সম্ভব। অনেকে আমার কাছে নার্সারি করার পরামর্শ নিতে আসেন। অনেকে নার্সারি গড়েও তুলেছেন। আমি তাদের যথাযথ পরামর্শ দিয়েছি।

 

চাকরি ছেড়ে সফল সবুজায়নের নারী উদ্যোক্তা অরনী

 

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিভাগে বিবিএ ও এমবিএ করা ইফতেসা অরনী। প্রায় এক দশক চাকরিও করেছেন একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারছেন না চাকুরিতে। উদ্যোক্তা হওয়ার বাসনা যার মনে, নিয়ম বাধা ৯-৫টার অফিসে কোন ভাবে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। এর মাঝে শুরু হয় করোনা মহামারী। অরনী বাধ্য হয়েই ঘরে বসে অফিস করা শুরু করেন। সংক্রমণ কমার পর যখন সশরীর অফিসে ফিরলেন, তখন আর খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না নিজেকে।

 

ইফতেসা অরনী

 

তাই চাকরি ছেড়ে শুরু করেন ছোট্ট একটা নার্সারি। সবুজায়নের ব্যবসা। শুরুর এক বছরের মাথাতে নার্সারি থেকে অরনীর মাসিক আয় ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এরপর আরও বিনিয়োগ করেন তিনি। সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসাটাই করবেন, অন্যের প্রতিষ্ঠানে আর চাকরি করবেন না। অরনী জানান, শুরুটা ছিলো মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে। সেই ব্যবসায় এখন পর্যন্ত তার বিনিয়োগ ১৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে কিছু টাকা গেছে জমি উন্নয়নে, একটা বড় খরচ হয়েছে পিকআপ ভ্যান কিনতে। তবে ব্যবসার অবস্থা বর্তমানে ভালো। ভবিষ্যতে এই ব্যবসাকে আরও বড় করতে চান তিনি।

অরনী আরও জানান, আমার ১০ বছরের সঞ্চয় দিয়ে ব্যবসাটা শুরু করেছি। প্রথম দিকে পরিবারের সহযোগিতা না পেলেও এখন বেশ ভালোভাবেই সাপোর্ট পাচ্ছি, যা আমার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। অরনী তার সবুজায়ন ব্যবসার নার্সারির নামও দিয়েছেন ‘অরনী’। নার্সারিতে যেসব গাছ রয়েছে তার বেশির ভাগই পাতাবাহার। তরুণ নারী উদ্যোক্তা অরনী জানান, বাড়ি ফিরলাম পাঁচ হাজার টাকার গৃহসজ্জার গাছ নিয়ে। তা দিয়েই শুরু। ফেসবুকে পেজ খোলা হলো। ছবি তুলে দেয়া শুরু করলাম। মাত্র তিন মাসের মধ্যে এত বেশি অর্ডার আসতে শুরু করল যে পাশের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করতে হলো। তিন মাস পর দেখা গেল তাতেও হচ্ছে না। তখন বাধ্য হয়েই আমিনবাজারের জমিতে চলে আসি। শুরুতে ফেসবুকে ‘অরনী’ পেজের মাধ্যমেই ব্যবসার শুরু করলেও এখন ঢাকার অদূরে আমিনবাজারে পাঁচ কাঠা জমির ওপর নার্সারি তৈরি করেছেন তিনি।

অরনী মূলত ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের সঙ্গে কাজ করেন। আমার মূল ব্যবসা হচ্ছে কোথায় কোন গাছ রাখা যাবে বা বসানো দরকার তা নির্ধারণ করা। তিনি আরও জানান, একটা অফিসে কতটা আলো আসে, রাতে কতক্ষণ বাতি জ্বলে, প্রাকৃতিক বাতাস চলাচল করে কিনা, নাকি এসি চলে ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে সে অনুযায়ী ক্রেতাকে গাছ পাঠানো হয়।

ভবিষ্যতে ‘অরনী’ নিয়ে পরিকল্পনা জানতে চাইলে জানান, ভবিষ্যতে গাছ ও গাছের পরিচর্যা সরঞ্জাম নিয়ে এক ছাদের নিচে একটি শপ দিতে চাই। যেখানে ক্রেতারা আসবেন, গাছ সম্পর্কে জানবেন, এরপর সিদ্ধান্ত নিয়ে গাছ কিনবেন। অরনী আরও বলেন, আমার ব্যবসা যদি পরিবেশের ওপর একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেটাই আমার বড় সাফল্য।

 

পোল্ট্রি খামারে সফল নারী উদ্যোক্তা

 

শ্বরদী শহরের অরনকোলা এলাকার নারী উদ্যোক্তা মোছাঃ রোকেয়া আক্তার উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর ২০০৩ সালে মোঃ আনোয়ার হোসেনের সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে এসে ১ হাজার মুরগির বাচ্চা দিয়ে পোল্ট্রি খামার শুরু করেন। পোল্ট্রি খামার করে মাত্র ১৪ বছরে আজ তিনি একজন সফল পোল্ট্রি খামারি। পোল্ট্রি খামারকে প্রসারিত করতে সব সময় কাজের মাঝে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পোল্ট্রি খামারের পাশাপাশি, মৎস্য চাষ, ধান চাষ ও সবজি উৎপাদন খামার গড়ে তুলেছেন। এর পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন শুধু এগিয়ে চলেছেন সামনের দিকে। রোকেয়া ইতোমধ্যে জাপানী একটি সংস্থায় কৃষির উপর ১৮ মাসের প্রশিক্ষন নিয়েছেন।

মোছাঃ রোকেয়া আক্তার

 

নারী উদ্যোক্তা রোকেয়া জানান, বিয়ের আগে ১ লক্ষ ৬০ হাজার ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি বানিজ্যিক লেয়ার ফার্মে ম্যানেজমেন্টে কর্মরত ছিলাম। বিয়ের পর স্বামীর সহযোগিতায় ২০০৩ সালে লেয়ার জাতের ১ হাজার মুরগি পালন শুরু করেন। সেই থেকে আর থেমে থাকেনি রোকেয়া। মুরগি পালন করে তিনি গোটা বছরের পারিবারিক ডিমের ও মুরগির চাহিদা মিটানোর পর ডিম ও মুরগি বিক্রি করে বাড়তি কিছু আয়ও করতে থাকেন। এরপর তিনি তার খামারকে প্রসারিত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বর্তমানে তার খামারে ৬ হাজার মুরগি রয়েছে এর মধ্যে ৪ হাজার মুরগি ডিম দেয় বাকি গুলো ছোট বাচ্চা। প্রতিদিন তিনি খামার থেকে ৩ হাজার ৮’শ ডিম বিক্রি করে থাকেন। রোকেয়া বলেন, বর্তমানে পোল্ট্রি ও সবজি খামারে ১৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। এর মধ্যে চারজন নারী ও দুইজন প্রতিবন্ধি শ্রমিক রয়েছে। রোকেয়া পোল্ট্রি খামারের স্বত্ত্বাধিকারি নারী উদ্যোক্তা মোছাঃ রোকেয়া আক্তার আরও বলেন, মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে পরিবেশ বান্ধব একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট করেছি তা থেকে পরিবারের রান্নার কাজ চলছে। এতে কিছুটা হলেও রান্নার কাজে দেশের গাছ, কাঠ বেঁচে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমার আর্থিক অবস্থা পোল্ট্রি খামার দেখে এলাকার অনেক বেকার ছেলে পোল্ট্রি খামার করে তারাও আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বি হয়েছেন। তিনি বলেন দেশের অবহেলিত নারী সমাজকে এগিয়ে নিতে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, গবাদি পশু পালন, নকশী কাঁথা, টেইলারিং, হস্তশিল্প ও কম্পিউটার প্রশিক্ষন সেন্টার গড়ে তুলতে চাই।

রোকেয়া বলেন, চাকরি নামের সোনার হরিণের পেছনে না ছুটে পোল্ট্রি খামার করে স্বাবলম্বি হওয়া সম্ভব। এতে বেকারত্ব ঘুচবে এবং আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়া যায়। তিনি শিক্ষিত বেকার যুবকদের পোল্ট্রি খামার করার জন্য আহ্বান জানান। ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোস্তফা জামান বলেন, রোকেয়া আক্তার পোল্ট্রি খামার করে আজ তিনি সফল ও মডেল খামারি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

রোকেয়া পোল্ট্রি খামার করে কিছুটা হলেও দেশের মুরগি ও ডিমের চাহিদা পূরণ করছেন। সেই সাথে দেশের মানুষের পুষ্টির যোগানও দিচ্ছেন। রোকেয়ার দেখা দেখি ওই এলাকায় বেকারদের মধ্যে পোল্ট্রি খামারের প্রতিযোগিতা চলে এসেছে। রোকেয়া পোল্ট্রি খামারটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ভাবে সাজানো গোছানো। রোকেয়া এভাবে তার পোল্ট্রি খামারের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারলে আগামিতে স্বর্ণ শিখরে পৌছানো সময়ের ব্যাপার মাত্র।

 

ঘরে বসে ২/৩ ঘন্টার কাজ করে আজ সফল উদ্যোক্তা

 

সানজিদা খন্দকার। খুলনার মেয়ে, জন্ম চট্টগ্রামে। বড় হয়েছেন আরেক শহর রাজশাহীতে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। লেখাপড়া করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনে। সানজিদার আশপাশের অনেককেই সন্তান হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দিতে দেখে ‘টু আওয়ার জব’ আইডিয়াটা আসে তার মাথায়। ভাবলেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে চাকরি কীভাবে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। যারা ৮ ঘণ্টা অফিস করতে পারছেন না, তারা কি অল্প সময়ের জন্য কিছু করতে পারেন না! এই সমস্যার সমাধানে নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে শুরু করেন তার নিজের প্রতিষ্ঠান ‘দ্য টু আওয়ার জব’ নারীদের জন্য সানজিদাই বাংলাদেশে প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন। বর্তমানে ৪ হাজারের বেশি মেম্বার, ৬০০-এর বেশি কর্মকর্তা আছেন এই প্রতিষ্ঠানে, যারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সফল নারীদের এগিয়ে যাওয়ার তালিকায় সানজিদা খন্দকার একটি তারার নাম। ‘দ্য টু আওয়ার জব’ উদ্দেশ্য কী? ২০ থেকে ৪০ বছর বয়স হলো একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কর্মক্ষম সময়। এ সময়ে ছেলেরা খুব সুন্দরভাবে তার কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকে। কিন্তু একজন নারী ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিয়ে, বাচ্চা ও পরিবার নিয়ে। অথচ ছেলেমেয়ে উভয়কেই একই কষ্ট করতে হয়। একটি মেয়ের জন্য সন্তান ও পরিবারও জরুরি। তার অনেক দায়িত্ব, মেয়েটি যেন পরিবার মানিয়ে চলতে গিয়ে ক্যারিয়ার থেকে ছিটকে না পড়ে। সেজন্যই আমরা কাজ তার ঘরে এনে দিচ্ছি, যেন সে ঘরে বসে চালিয়ে যেতে পারে তার কাজ।

সানজিদা খন্দকার

 

এর পেছনের গল্প কী? আমি লক্ষ করে দেখতাম আমার বন্ধু এবং পরিবারের অনেক মেয়ে অফিসে ৮ ঘণ্টা সময় দিতে হয় বলে চাকরি করছে না। পরিবারের পাশাপাশি তারাও কিছু একটা করতে চায়। ৮ ঘণ্টা চাকরি করা অনেকের কাছেই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তখন ভাবতাম ২ বা ৩ ঘণ্টার জন্য কিছু যদি করতে পারতাম। তখন খুঁজে পাইনি এই সমস্যার সমাধান। চিন্তা করলাম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আমি আমার সমস্যার সমাধান করতে পারি। এ থেকেই আমার প্রতিষ্ঠানের পথ চলা শুরু। এটি চালু হওয়ার পর কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন? ক্যারিয়ার ব্রেকে যাওয়া নারীদের যোগ্যতা নিয়ে অনেকেই সন্ধিহান থাকেন। মনে করেন কাজের বাইরে থাকার জন্য হয়তো তার কাজের সেই যোগ্যতাটুকু আর নেই। আসলে এটা ভুল। ট্যালেন্ট এবং স্কিল বা অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড কখনোই একটা ব্রেকের কারণে মুছে যায় না; বরং তাদের মনে কাজ ফিরে পাওয়ার অসম্ভব ইচ্ছে কাজ করে। আর ইচ্ছেটাই তাদের কর্মদক্ষতাকে বাড়িয়ে দেয়।

টু আওয়ার্স জবের কাজ কী? প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দ্বারা প্রতিষ্ঠান ও নারীকর্মীদের সংযুক্ত করা। ফলে ওই নারী উক্ত প্রতিষ্ঠানের কাজ ঘরে বসেই করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় পর্যায়ে হোক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বা প্রাইভেট বা মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানেরই হোক, তাদের নিরাপত্তা এবং স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। ব্লগ লেখা থেকে শুরু করে এই ওয়েবসাইটে পেশাদার লেখা, ব্যবসায় সহায়তা, প্রোগ্রামিং, প্রযুক্তি, গ্রাফিকস, ডিজিটাল মার্কেটিং, অডিও সাপোর্ট, মার্কেট রিসার্চ, জীবনধারা, বিনোদন, গবেষণা, বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন ধরনের সেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তাদের প্রয়োজনীয় সেবা পেতে সাইটে ভিজিট করতে পারবেন। দক্ষ নারীরা লগ ইন করে সাইটে নিবন্ধন করতে পারবেন। ফেসবুকের মতো লগিং করে নাম ও সাধারণ কিছু তথ্য দিয়ে এই প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত হওয়া যাবে। ওয়েবসাইটিতে ব্যাংক ট্রান্সফার অথবা ভিসা মাস্টারকার্ড অথবা বিকাশের মাধ্যমে নিরাপদে পারিশ্রমিক পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে।

নারী হিসেবে পরিবারের কাছ থেকে কেমন সহযোগিতা পেয়েছেন? বাবা-মায়ের কাছ থেকে অনেক বেশি সাপোর্ট পেয়েছি। আমার নিজের পরিবারও অনেক সহযোগী ছিল এ বিষয়ে। তারা যতটা না আমার জন্য ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ও হাজারো নারীর জন্য। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের সফলতা? আমার অবস্থান থেকে আমি অনেক সন্তুষ্ট। অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল এই পথটা। একবার যখন দাঁড় করাতে পেরেছি, বাকিটা পথ অবশ্যই পারব বলে মনে করি। একটি মেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সে আরো তিনগুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে যায় মা হওয়ার পর। একজন নারী চিন্তা করে কীভাবে তার সন্তানের জন্য একটি ভালো পরিবেশ এবং সময় তৈরি করা যায়। আর এটা একজন উদ্যোক্তার শ্রেষ্ঠ গুণ। আমি মনে করি, উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের আরো বেশি এগিয়ে আসা উচিত। কেননা তারা নির্ভেজালভাবে সমাজের ও মানুষের মঙ্গল কামনা করে। নারী উদ্যোক্তা হতে গেলে একজন নারীর কী কী গুণ থাকা প্রয়োজন? সবচেয়ে বড় বিষয় আশাকে ধরে রাখা। অনেক চ্যালেঞ্জ থাকবে, ধৈর্য থাকতে হবে। সেই সঙ্গে অনেক ধীরস্থির থাকা জরুরি। হতাশ হওয়া যাবে না, কারণ একদিন সফলতা আসবেই। আমরা নারীরা নিজেরাই নিজেদের অনেক দুর্বল ভাবি। আর তাই আমি বলি, একজন নারী ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রমের অদ্ভূত সংমিশ্রণের মাধ্যমে প্রকৃত নারী হয়ে ওঠে। নারীকে বলব- নিজেদের সম্মান করুন, নিজেদের দুর্বল ভাববেন না। নিজের শক্তিকে অনুভব করুন। তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

বিশেষ প্রতিবেদন।। নারী যখন অনুপ্রেরণা

আপডেট সময় : ০২:৫৮:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ মার্চ ২০২৩

পরিবারের চৌহদ্দী থেকে বেড়িয়েছে অনেক আগেই। তবে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যেতে হয়েছে। লড়াই কিন্তু এখন চলছে। সেই লড়াইয়ে জীবনের নতুন গল্প যোগ হয়েছে । যেখানে সফলতা অনুপ্রেরণা যুগিয়ে চলছে অন্যদের। আজ আর্ন্তজাতিক নারী দিবসে নিউজ ফর জাস্টিস তেমনি কিছু মানুষের গল্প তুলে ধরছে এই বিশেষ আয়োজনে…

 

শাহিন বাবু

 

সময় স্বপ্ন ছিল সরকারি চাকরি করবেন কিংবা আইনজীবী হবেন। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে লেখাপড়া শেষ করে অবশ্য সে পথে আর হাঁটেননি শায়লা আখন্দ। বরং দেশীয় ঐতিহ্য ধরে রেখে গ্রামীণ ঐতিহ্যের খাবারগুলো নতুন করে জনপ্রিয় করতে উদ্যোক্তা হয়ে উঠলেন। ২০০৯ সালে তার উদ্যোক্তা জীবনের শুরু।

ঐতিহ্যবাহী সব দেশীয় খাবার যেমন মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া, নিমকি, মুরালি, মনেক্কা, শাহি খুরমা, বাদাম পাপড়ি, বাদাম টানা, তিল পাপড়ি, তিল টানা, নারকেল নাড়ু, তিল নাড়ু, নানারকম পিঠা, শবে-বরাতের হালুয়া, প্যাকেটজাত মশলা পাওয়া যায় তার উদ্যোগ ‘সতেজ’-এ। আছে বিভিন্ন রকমের বৈশাখী গিফট আইটেম।

শায়লা আখন্দ

 

উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সেরকম কারো সহযোগিতা বা সমর্থন পাননি। “পেছনের অনেক গল্প আছে, আশেপাশের মানুষ ও পরিবারে মানুষদের আমার পাশে না থাকা, এটা ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। পরে বুঝাতে সক্ষম হলাম যে আমি কিছু করতে পারবো ও একজন ভাল উদ্যোক্তাও হতে পারব,” এভাবে নিজের সফলতার কথা উদ্যোক্তা বার্তাকে জানান শায়লা আখন্দ। শুরুতে পরিবারের অন্যদের সহায়তা না পেলেও তার উদ্যোক্তা জীবনের শুরু থেকে বড়  অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন তার হাসব্যান্ড।

শায়লার কর্মভুবনে এখন ৩০ -৩৫ জন কর্মী আছেন। অনলাইনে তার পেইজ ‘সতেজ ফুড’। পণ্য যাচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ড শপে, যার মধ্যে আছে স্বপ্ন, মীনা বাজার,  সি. এস.  ডি, প্রাণ ডেইলি শপিং, বেস্ট বাই, ট্রাস্ট ফ্যামিলি নিডস্, ইউনিমার্ট এবং লাজ ফার্মা। খুচরা বাজারেও যাচ্ছে তার পণ্য।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় তিনি জানান, “আমি চাই দেশীয় ঐতিহ্য যেনো হারিয়ে না যায়। সেসঙ্গে বিদেশেও আমাদের পণ্যের প্রসার ও পরিচিতি করাতে চাই।”

 

 একজন সফল নারী উদ্যোক্তা তানিয়া

 

নিজের ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আজকের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে বহুদূর। তেমনি ভাবে একজন সফল গৃহিণীর পরিচয়ের পাশাপাশি একজন সফল উদ্যোক্তার পরিচয় গড়ে তুলেছেন তানিয়া চৌধুরী । তিনি বলেন,

তানিয়া চৌধুরী

 

“আমি  আমি একজন গৃহিনী। বর্তমানে পড়াশোনা করছি মাস্টার্স, বাংলা সাহিত্য নিয়ে লালমাটিয়া সরকারি মহিলা কলেজ থেকে। পড়াশোনার পাশাপাশি আমার ছোট একটি অনলাইন বিজনেস রয়েছে। যেখানে আমি সাধারণত হোমমেড ফুড ও কেক তৈরি করে সেল করে থাকি। নারীরা আজ আত্মনির্ভরশীল। আর সেইটা প্রমাণ করার জন্যই আমার এই ছোট উদ্যোগ। শুধুমাত্র একজন সফল গৃহিণী ও মা হিসেবে নয় পাশাপাশি নিজেকে দেখতে চেয়েছি একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে।

খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় আমার। সেই সঙ্গে খুব তাড়াতাড়িই প্রথম বেবি কনসিভ করি। অল্প বয়সেই সংসারের সব কিছু গুছিয়ে নিয়েছিলাম খুব সহজেই। কিন্তু ঘর সামলানোর পাশাপাশি নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলতে চেয়েছিলাম সবসময়। যেহেতু ঘর আর ছোট বাচ্চা সামলানোর পাশাপাশি বাহিরে গিয়ে কিছু করা আমার পক্ষে তেমন সম্ভব হচ্ছিলো না তাই চিন্তা করে ঘরে বসেই কিছু করার।

আমি নানান রকম মজাদার রান্না করতে বেশ পছন্দ করি। এছাড়া আমার মেয়ে আনিশা কেক খেতে বেশ পছন্দ করে। তাই হরেক রকমের কেকও বানাতাম ঘরের সবার জন্য। এবং আমার কেক খেতে সবাই খুব পছন্দ করতেন এবং প্রশংসাও করতেন। সে থেকেই মাথায় আসলো আমি আমার রান্নার স্কিলকে কাজে লাগিয়ে একটি অনলাইন হোমমেড ফুড সার্ভিস খুলতে পারি। এর ফলে যারা বাহিরের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পছন্দ করেন না এবং হোমমেড স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খুঁজে থাকেন তাদের জন্যও উপকারী এবং আমার জন্য বেশ সহজ ও আনন্দময়ী একটি কাজ হবে।

স্বাবলম্বী হওয়ার সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে শুরু করি আমার একটু একটু করে পথচলা। Anishas Homemade Foods and Cake Shop নামক একটি অনলাইন পেজ খুলার মাধ্যমেই আমার বিজনেস এর প্রথম যাত্রা শুরু হয়। পেইজ খোলার পর আমার রান্নার ও কেক এর নানান রকম ছবি আমি শেয়ার করতে থাকি। কিছুদিন পরেই আমার অর্ডার চলে আসতে থাকে। এতো স্বল্প সময়ে যে এতো সারা পাবো আমি কখনো ভেবে উঠতে পারিনি। আমার প্রথম কাস্টমার ছিলেন আমারই প্রতিবেশী এক ভাবী।

আমার এই কাজে আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রানিত করেছে আমার পরিবার। তারা আমাকে উৎসাহ দেয় আমার কাজ কে এগিয়ে নেয়ার জন্য। বিজনেস শুরু করার আগে তাদের উৎসাহে আমি ছোট একটি কেক বানানোর উপর কোর্স ও করে থাকি। তারা আমার পাশে না থাকলে আমি সাহস পেতাম না এতো দূর এগিয়ে যাওয়ার।

সবাই যেহেতু আমার পাশে ছিল তাই আলহামদুলিল্লাহ বিজনেসে আমার তেমন কোন বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়নি। সব বেশ ভালো যাচ্ছিলো। কিন্তু কিছুদিন পরই আমি দ্বিতীয় বার কন্সিভ করি। এতে একটু কষ্ট হলেও আমি থেকে থাকিনি। 6 মাসের প্রেগনেনসি নিয়ে প্রচুর কাজ করেছি আলহামদুলিল্লাহ । আমার স্বামী সবসময় আমার পাশে ছিলেন । আমাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছিলেন সেইসময়। তাই আমাকে আর পিছিয়ে পরতে হয়নি। সবচেয়ে বেশি পাশে ছিল আমার ননদ জলি। ও বাবু দের না দেখলে এতো সুন্দর ভাবে সব কিছু সামলানো অনেক কষ্ট সাধ্য ছিল।

আব্বু-আম্মুর দোয়া ও আমার কাস্টমারদের সাপোর্ট ,ভালোবাসায় এখন আমি স্বাবলম্বী। এখন আমি আমার অনলাইন বিজনেস এর পাশাপাশি নিজেই বেকিং বিষয় নিয়ে কোর্স করিয়ে থাকি। যা আবার বিজনেসের পাশাপাশি আরও একটি নতুন উদ্যোগ। আলহামদুলিল্লাহ্‌ এখন আমি একজন সফল উদ্যোক্তা। এখন আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একটাই আমার এই হোমমেড ফুড বিজনেজ-এর সঙ্গে আমার এই নতুন উদ্যোগটিকে অনেক দূর নিয়ে যাওয়া। শেখার কোন শেষ নেই, তাই শিখতে চাই আরও অনেক কিছু ।

 

সুইজারল্যান্ড, ইতালিসহ আট দেশে যায় মাকসুদার পণ্য

 

নিজের জমানো অর্থ ও গহনা বিক্রির টাকা দিয়ে ২০১৬ সালে ব্যবসা শুরু করেন ঢাকার মেয়ে মাকসুদা খাতুন। তার ‘শাবাব লেদার’ নামের প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথমে পাঁচজন শ্রমিক থাকলেও বর্তমানে কাজ করছেন অর্ধশতাধিক শ্রমিক। শুরুতে দুটি মডেলের চামড়ার লং জেন্টস ওয়ালেট বানালেও বর্তমানে তার ফ্যাক্টরিতে তৈরি হচ্ছে এক্সিকিউটিভ ব্যাগ, এক্সিকিউটিভ ফাইল, লেডিস ব্যাগ, মেসেঞ্জার ব্যাগ, লেডিস পার্স, ব্যাকপ্যাক, বেল্ট, মাউস প্যাড, চাবির রিং, করপোরেট গিফট আইটেম, পেন হোল্ডার, পেন স্ট্যান্ড, ডায়েরি কভার, জ্যাকেটসহ যাবতীয় চামড়াজাত পণ্য।

যখন শুরু করি তখন চারপাশের মানুষজন বলতে শুরু করে, মেয়েরা আবার ব্যবসা করে নাকি। বড় জোর টিচিং কিংবা ব্যাংকে চাকরি করবে। ফ্যামিলি থেকে বাধা তো ছিলই, পাশাপাশি পুঁজির একটা অভাব ছিল। তবে নিজে কিছু করার একটা জেদ ছিল, তাই হয়তো সব বাধা অতিক্রম করতে পেরেছি

মাকসুদা বলেন, বর্তমানে সুইজারল্যান্ড, ইতালি, গ্রিসসহ আট দেশে আমার পণ্য যায়। নিজেরা তৈরির পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট লাগেজ, কারুপণ্যসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছি। এছাড়া করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে সাপোর্ট দিচ্ছি। করোনা-পরবর্তী সময়ে আমরা অনলাইনে ব্যাপক রেসপন্স পেয়েছি। দারাজ, দেশিবেশিসহ বেশকিছু ই-কমার্স প্লাটফর্মে আমাদের পণ্য পাওয়া যায়। এছাড়া এফ-কমার্সেও আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি।

উচ্চশিক্ষা শেষে শিক্ষকতা পেশায় মনোনিবেশ করেছিলেন মাকসুদা। তবে সবসময়ই নিজে কিছু করার আগ্রহ ছিল তার। মাকসুদার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পাশাপাশি পার্টনারশিপে চামড়াজাত পণ্য রফতানি করছিলেন। এক পর্যায়ে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে স্বামীর ব্যবসার হাল ধরেন মাকসুদা। নানা জটিলতায় লোকসান হতে থাকায় বন্ধ হয়ে যায় স্বামীর ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সেই সময় প্রায় ৭০ লাখ টাকা ঋণের বোঝা মাথায় আসে মাকসুদা দম্পতির। তাতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মাকসুদার স্বামী। নিজে শক্ত থেকে ব্যবসা দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন মাকসুদা। প্রথমে নিজেই বিভিন্ন দোকানে উৎপাদিত পণ্যের বিপণন শুরু করেন।

মাকসুদা বলেন, ঋণের পরিমাণটা এতো ছিল যে; আমি বুঝতে পারি চাকরি করে এটা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তখন ব্যবসাটা মোটামুটি আয়ত্ত করে ফেলেছি। পুরোনো কিছু যন্ত্রপাতি কিনে শুরু করি। বুঝতে পারছিলাম নিজের পরিবারের জন্য কিছু করতে হবে। ঋণ শোধ করতে হবে। তা না হলে দুদিন পরে জেলে যেতে হবে। কেরানীগঞ্জে একটি ফ্ল্যাট, কিছু গহনা বিক্রি ও ডিপিএস ভেঙে কিছু ঋণ শোধ করলাম। প্রায় ১০ লাখ পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। এখন প্রায় ৩০টির মতো শোরুমে আমার পণ্য যাচ্ছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে একটি শোরুম নিয়েছি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফুটওয়্যার বিজনেস শুরু করেছি। এছাড়া বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ‘প্রেসিডেন্ট’-এ আমার পণ্য যাচ্ছে। ব্যাংক-বীমাসহ আটটা করপোরেট প্রতিষ্ঠানে শাবাব লেদার সাপোর্ট দিয়ে থাকে। আরও কয়েকটিতে কথা বলছি।

তিনি বলেন, শুধু পুরুষরাই নারীদের জায়গা করে দেবে, তা নয়। নারীদের নিজের জন্য পরিচয় তৈরি করতে হবে। একইসঙ্গে বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য কাজ করতে হবে। নিজে সৎ থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যে সব বাধাই অতিক্রম করা যায় জানিয়ে তিনি বলেন, সব ধরনের লাইসেন্স, পেপার— সবকিছু আমি দ্রুত করতে পেরেছি। সেসব সমস্যা অন্য সব উদ্যোক্তা ফেইস করেন, আমিও সেসব ঘটনা ফেইস করেছি।

এই উদ্যোক্তা বর্তমানে ওমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর বাংলাদেশ, ওমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর, নতুন প্রজন্ম, চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব, যুব উন্নয়ন অধিদফতর, বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশনসহ বেশকিছু সংস্থার সঙ্গেও কাজ করছেন।

চার হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু শামার

 

০০৩ সালে মাত্র চার হাজার টাকা দিয়ে বুটিক ব্যবসা শুরু করেন শাফিয়া শামা। তখন রাজধানীর বেশকিছু ফ্যাশন হাউসে তৈরি পোশাক সরবরাহ করতেন তিনি। ২০০৮ সালের দিকে পাটপণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। পাটের বহুমুখী পণ্য তৈরির লক্ষ্যে ফ্যাক্টরি করেন হাজারীবাগে। করোনার কারণে সেই ফ্যাক্টরি বর্তমানে বন্ধ হলেও অন্য ফ্যাক্টরিতে চলছে তার পাটপণ্য তৈরির কাজ।

শাফিয়া শামার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘এমএস শামা’। নেদারল্যান্ডসসহ বেশকিছু দেশে রফতানি হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানের পণ্য। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, ব্র্যাক ও এর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, রবি, আইসিডিডিআরবিসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে পাটপণ্য সরবরাহ করে ‘এমএস শামা’। সাফিয়া শামার পণ্যের ব্র্যান্ডের নাম ‘উড়ান’। অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে উড়ানের পণ্য। পাটের প্রশিক্ষণ ব্যাগ, পাটের ফাইল, পর্দা, কুশন কভার, সোফা কভার, কম্বল, পর্দা, টেবিল রানার, টেবিল ম্যাট, কার্পেট, ডোরম্যাট, শতরঞ্জি, শোপিস নিয়ে কাজ করেন শামা। এমনকি পাট দিয়ে তৈরি শাড়ি, ব্লেজার, ফতুয়া, কটিও বিক্রি করেন এই উদ্যোক্তা।

শাফিয়া শামা বলেন, ‘নিজের একটা পরিচয় গড়তে ব্যবসাটা শুরু করি। চাকরি করতে চাইলেও ফ্যামিলি রাজি ছিল না। আমি ছোটবেলা থেকে টিউশনি করতাম। নিজের খরচের টাকাটা নিজেই জোগাড় করতাম। বিয়ে হওয়ার পর যখন বাচ্চা হলো, তখন একটা বিষয় খুব ফিল করতাম। সেটা হলো ছোটখাটো বিষয়ের জন্য আরেকজনের কাছে টাকা চাইতে হয়। সেটা ভালো লাগতো না। তখন বাসায় থেকে ব্যবসাটা শুরু করি।’

তিনি বলেন, আমি রফতানি করি। ব্র্যাকসহ বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে আমার প্রোডাক্ট যাচ্ছে। প্যান্ডেমিকের মধ্যে আমার হাজারীবাগের ফ্যাক্টরিটা বন্ধ করে দিয়েছি। সেখানে প্রায় ৩০ জন কর্মী কাজ করতেন। এখন কিছু অর্ডার আসছে। আশা করছি শিগগিরই ফ্যাক্টরিটা চালু করতে পারবো। ব্যবসা করতে গিয়ে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, যখন শুরু করি তখন চারপাশের মানুষজন বলতে শুরু করে, মেয়েরা আবার ব্যবসা করে নাকি। বড় জোর টিচিং কিংবা ব্যাংকে চাকরি করবে। ফ্যামিলি থেকে বাধা তো ছিলই, পাশাপাশি পুঁজির একটা অভাব ছিল। তবে নিজে কিছু করার একটা জেদ ছিল, তাই হয়তো সব বাধা অতিক্রম করতে পেরেছি। তিনি আরও বলেন, অনলাইনে উড়ান নামে একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি শুরু করেছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে পিছিয়ে গেছি। সেটাকে ফের চাঙ্গা করতে কাজ শুরু করেছি।

বাধা পেরিয়ে সফল উদ্যোক্তা হাসিনা মুক্তা

 

ছোটবেলা থেকেই নিজের পোশাক নিজে তৈরি করার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজে মনোযোগী ছিলেন হাসিনা মুক্তা। ২০০৯ সালে ‘নতুনত্ব বুটিকস ও হস্তশিল্প’ নামে তৈরি পোশাক, ক্রাফটস উৎপাদন ও বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান করেন হাসিনা। একইসঙ্গে নিজ বাড়িতে হস্তশিল্প ট্রেনিং সেন্টার চালু করেন। সেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন।

ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ১৯৯৮ সালে যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে পোশাক তৈরি ও ব্লক-বাটিকের প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৯৯ সালে বিয়ের পর বিভিন্ন সময় যুব উন্নয়ন অধিদফতরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেন। পরে স্বামীর সহযোগিতায় কয়েকটি সেলাই মেশিন ক্রয় করে বুটিকসের কাজ শুরু করেন এই উদ্যোক্তা। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ব্যাগ, ম্যাট, কলমদানি, পাপোস ব্লক-বাটিকসহ নকশীকাঁথা, শাড়ি, বিছানার চাদর, কুশন কভার তৈরি হয় মুক্তার নতুনত্ব বুটিকস ও হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানে।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমি কিছু ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছি। একটা শোরুম আছে, পাশাপাশি আমার কারখানায় প্রায় ৬০ জন কর্মী কাজ করছেন। ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু হলেও বর্তমানে আমার মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ টাকায়। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামীণ নারীদের দিয়ে নকশীকাঁথাসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পের কাজ করছি আমরা। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ হাসিনা মুক্তা ২০১৩ সালে পান নেলসন ম্যান্ডেলা অ্যাওয়ার্ড। সেই বছর নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পান কবি নজরুল সম্মাননা। নারীসেবা ও মানব উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সম্মাননাও পান তিনি। ২০১৪ সালে মহিলা আত্মকর্মসংস্থানকর্মী হিসেবে পান জাতীয় যুব পুরস্কার।

 

অনলাইন ব্যবসায় সফল নারী

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল খুলেই বেশির ভাগ নারী উদ্যোক্তা নিজের হাতে তৈরি করা পণ্য বিক্রি করে সাধারণ গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করছেন। আবার অনেকেই ওয়েবসাইট খুলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছেন ভৈরবসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

নিজেদের আইডিয়া কাজে লাগিয়ে ‘উই (ওমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম)’-এর সদস্য ভৈরবের নারী উদ্যোক্তা শোভা খানমের ‘রমণীর রং’ মিশু আক্তারের ‘দেশি রং দেশি ঢং’ আদ্রৌ জুইয়ের ‘ব্রাইডাল কালেকশন’ নাবিলা রহমানের ‘নাবিলা ক্রাফট অ্যান্ড ক্রিয়েশন’ মেহবুবা ফেরদৌস মিথিলা বিজনেস পেজ ‘আহরিকা, লামিয়া চৈতির ‘গুড ফুড’ ফারজানা আক্তারের ‘মাটির বাহার’ সহ বিভিন্ন নজরকারা নামে বিজনেস পেজে হাতের তৈরি নানা রকমের মশলা, ছাতুসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য, হাতের কাজের গহনা, শাড়ি, থ্রি-পিচ, টু-পিচ, টপস, ব্লাউজ, পাঞ্জাবি, বিচানার চাদর, কোশন কভার, কসমেটিকস, মাটির তৈজসপত্র, অর্গানিক টিউব মেহেদি, আর্টিফিশিয়াল ফ্লাওয়ার ছাড়াও দেশীয় প্রজাতির মাছ ও হাঁস-মুরগির মাংস প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছেন অনলাইনে।

শুধু অনলাইন মাধ্যমকেই কাজে লাগিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যান্য বেকার নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে আর্থিক সচ্ছলতার পথকে সুগম করছেন তারা। অন্যদিকে অনলাইনে অর্ডার করে ঘরে বসেই পণ্য পাওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা অনলাইন ব্যবসাকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। নারী উদ্যোক্তারা জানান, করোনাকালে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের চাকরি হারিয়ে অনেকেই বেকার হয়ে পড়ে। আবার পুরুষরা ছোটখাটো ব্যবসা করে যারা পরিবারের অর্থ জোগান দিত তাদেরও ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক অভাব অনটনে দিন কাটে। আর এসব কারণেই তারা অনলাইনে ব্যবসার চিন্তা করে। ঘরে বেকার বসে না থেকে অল্প পুঁজি খাটিয়ে ফেসবুক পেজ খুলে অনলাইনে নিজেদেরও তৈরি পণ্য বিক্রি শুরু করে। অনলাইনে ক্রেতাদের সাড়া পাওয়ায় তাদের ব্যবসাকে ছোট থেকে মাঝারি ও বড় পরিসরে গড়ে তুলতে পরিশ্রম করছেন তারা। অক্লান্ত পরিশ্রমই আর্থিক সচ্ছলতার মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করছে।

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার লুবনা ফারজানা বলেন, অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচ্ছল জীবনযাপনে সুন্দর পথে এগিয়ে নিবে। করোনা পরিস্থিতিতে অনেকেই নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সফলতা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা পেয়েছে। ভৈরবের বেশির ভাগ অনলাইন উদ্যোক্তাই কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও গৃহিণী। তারা নিজেরাই নিজেদের কর্মের ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। ইতিমধ্যেই ভৈরব উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে অর্ধশত নারী উদ্যোক্তাকে আর্টিফিশিয়াল ফ্লাওয়ার তৈরি বিষয়ক দক্ষতাবৃদ্ধি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয় ও উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। এ ছাড়াও নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক ঋণ সহায়তার ব্যবস্থা করবেন বলে তিনি জানান।

 

নার্সারি করে সফল নারী উদ্যোক্তা, বছরে আয় ৩৫ লাখ

 

নারী উদ্যোক্তা জেসমিন আরা। নিজেকে শুধু গৃহিণী হিসেবে নয়, সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। ময়মনসিংহের পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ঘেঁষা গৌরীপুর উপজেলার কাশিয়ারচর এলাকায় ‘আধুনিক নার্সারি অ্যান্ড হর্টিকালচার ফার্ম’ নামে একটি নার্সারি গড়ে তুলেছেন তিনি। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের অধীনে বৃক্ষরোপণে বিশেষ অবদান রাখায় জেসমিন আরা জাতীয় পুরষ্কার লাভ করেন। জেসমিন আরা নিজের ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে গৃহিণীর পরিচয়ের পাশাপাশি সফল উদ্যোক্তার পরিচয় গড়ে তুলেছেন।

জেসমিন আরা

 

দেখা যায়, জেসমিন আরার নার্সারিতে দেশি-বিদেশি জাতের আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, কমলা, আমড়া, লেবু, জাম্বুরা, লটকনসহ বিভিন্ন জাতের অসংখ্য চারা রয়েছে। শ্রমিকদের পাশে দাড়িয়ে পরিচর্যার কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন জেসমিন। তার নার্সারিতে কাজ করা শ্রমিকরা এখানে কাজ করে তারাও স্বচ্ছল হয়েছেন।

জেসমিন আরা বলেন, আমি পুরোদস্তুর গৃহিনী ছিলাম। কিছু একটা করার প্রবল ইচ্ছা থেকে স্বামী ময়মনসিংহ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বিনা) উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শামছুল আলম মিঠুর পরামর্শ নিয়ে ২০১৯ সালে নার্সারি শুরু করি। ধীরে ধীরে সফলতা পেয়েছি। বর্তমানে ১২ একর জায়গায় ৩০০ প্রজাতির উন্নত মানের ৪ লক্ষাধিক চারা রয়েছে আমার নার্সারিতে। নার্সারিতে নিয়মিত ২১ জনসহ ৩৫ জন শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বছরে ৩৫ লাখ টাকার চারা বিক্রি করতে পারি। আমার নার্সারির চারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতারা এসে নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নারীদের আত্মনির্ভরশীল হতে নিজের ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমের প্রয়োজন। সঠিক পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে কোনো কিছুর উদ্যোগ গ্রহন করলে তাতে সফল হওয়া সম্ভব। অনেকে আমার কাছে নার্সারি করার পরামর্শ নিতে আসেন। অনেকে নার্সারি গড়েও তুলেছেন। আমি তাদের যথাযথ পরামর্শ দিয়েছি।

 

চাকরি ছেড়ে সফল সবুজায়নের নারী উদ্যোক্তা অরনী

 

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিভাগে বিবিএ ও এমবিএ করা ইফতেসা অরনী। প্রায় এক দশক চাকরিও করেছেন একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারছেন না চাকুরিতে। উদ্যোক্তা হওয়ার বাসনা যার মনে, নিয়ম বাধা ৯-৫টার অফিসে কোন ভাবে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। এর মাঝে শুরু হয় করোনা মহামারী। অরনী বাধ্য হয়েই ঘরে বসে অফিস করা শুরু করেন। সংক্রমণ কমার পর যখন সশরীর অফিসে ফিরলেন, তখন আর খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না নিজেকে।

 

ইফতেসা অরনী

 

তাই চাকরি ছেড়ে শুরু করেন ছোট্ট একটা নার্সারি। সবুজায়নের ব্যবসা। শুরুর এক বছরের মাথাতে নার্সারি থেকে অরনীর মাসিক আয় ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এরপর আরও বিনিয়োগ করেন তিনি। সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসাটাই করবেন, অন্যের প্রতিষ্ঠানে আর চাকরি করবেন না। অরনী জানান, শুরুটা ছিলো মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে। সেই ব্যবসায় এখন পর্যন্ত তার বিনিয়োগ ১৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে কিছু টাকা গেছে জমি উন্নয়নে, একটা বড় খরচ হয়েছে পিকআপ ভ্যান কিনতে। তবে ব্যবসার অবস্থা বর্তমানে ভালো। ভবিষ্যতে এই ব্যবসাকে আরও বড় করতে চান তিনি।

অরনী আরও জানান, আমার ১০ বছরের সঞ্চয় দিয়ে ব্যবসাটা শুরু করেছি। প্রথম দিকে পরিবারের সহযোগিতা না পেলেও এখন বেশ ভালোভাবেই সাপোর্ট পাচ্ছি, যা আমার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। অরনী তার সবুজায়ন ব্যবসার নার্সারির নামও দিয়েছেন ‘অরনী’। নার্সারিতে যেসব গাছ রয়েছে তার বেশির ভাগই পাতাবাহার। তরুণ নারী উদ্যোক্তা অরনী জানান, বাড়ি ফিরলাম পাঁচ হাজার টাকার গৃহসজ্জার গাছ নিয়ে। তা দিয়েই শুরু। ফেসবুকে পেজ খোলা হলো। ছবি তুলে দেয়া শুরু করলাম। মাত্র তিন মাসের মধ্যে এত বেশি অর্ডার আসতে শুরু করল যে পাশের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করতে হলো। তিন মাস পর দেখা গেল তাতেও হচ্ছে না। তখন বাধ্য হয়েই আমিনবাজারের জমিতে চলে আসি। শুরুতে ফেসবুকে ‘অরনী’ পেজের মাধ্যমেই ব্যবসার শুরু করলেও এখন ঢাকার অদূরে আমিনবাজারে পাঁচ কাঠা জমির ওপর নার্সারি তৈরি করেছেন তিনি।

অরনী মূলত ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের সঙ্গে কাজ করেন। আমার মূল ব্যবসা হচ্ছে কোথায় কোন গাছ রাখা যাবে বা বসানো দরকার তা নির্ধারণ করা। তিনি আরও জানান, একটা অফিসে কতটা আলো আসে, রাতে কতক্ষণ বাতি জ্বলে, প্রাকৃতিক বাতাস চলাচল করে কিনা, নাকি এসি চলে ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে সে অনুযায়ী ক্রেতাকে গাছ পাঠানো হয়।

ভবিষ্যতে ‘অরনী’ নিয়ে পরিকল্পনা জানতে চাইলে জানান, ভবিষ্যতে গাছ ও গাছের পরিচর্যা সরঞ্জাম নিয়ে এক ছাদের নিচে একটি শপ দিতে চাই। যেখানে ক্রেতারা আসবেন, গাছ সম্পর্কে জানবেন, এরপর সিদ্ধান্ত নিয়ে গাছ কিনবেন। অরনী আরও বলেন, আমার ব্যবসা যদি পরিবেশের ওপর একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেটাই আমার বড় সাফল্য।

 

পোল্ট্রি খামারে সফল নারী উদ্যোক্তা

 

শ্বরদী শহরের অরনকোলা এলাকার নারী উদ্যোক্তা মোছাঃ রোকেয়া আক্তার উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর ২০০৩ সালে মোঃ আনোয়ার হোসেনের সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে এসে ১ হাজার মুরগির বাচ্চা দিয়ে পোল্ট্রি খামার শুরু করেন। পোল্ট্রি খামার করে মাত্র ১৪ বছরে আজ তিনি একজন সফল পোল্ট্রি খামারি। পোল্ট্রি খামারকে প্রসারিত করতে সব সময় কাজের মাঝে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পোল্ট্রি খামারের পাশাপাশি, মৎস্য চাষ, ধান চাষ ও সবজি উৎপাদন খামার গড়ে তুলেছেন। এর পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন শুধু এগিয়ে চলেছেন সামনের দিকে। রোকেয়া ইতোমধ্যে জাপানী একটি সংস্থায় কৃষির উপর ১৮ মাসের প্রশিক্ষন নিয়েছেন।

মোছাঃ রোকেয়া আক্তার

 

নারী উদ্যোক্তা রোকেয়া জানান, বিয়ের আগে ১ লক্ষ ৬০ হাজার ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি বানিজ্যিক লেয়ার ফার্মে ম্যানেজমেন্টে কর্মরত ছিলাম। বিয়ের পর স্বামীর সহযোগিতায় ২০০৩ সালে লেয়ার জাতের ১ হাজার মুরগি পালন শুরু করেন। সেই থেকে আর থেমে থাকেনি রোকেয়া। মুরগি পালন করে তিনি গোটা বছরের পারিবারিক ডিমের ও মুরগির চাহিদা মিটানোর পর ডিম ও মুরগি বিক্রি করে বাড়তি কিছু আয়ও করতে থাকেন। এরপর তিনি তার খামারকে প্রসারিত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বর্তমানে তার খামারে ৬ হাজার মুরগি রয়েছে এর মধ্যে ৪ হাজার মুরগি ডিম দেয় বাকি গুলো ছোট বাচ্চা। প্রতিদিন তিনি খামার থেকে ৩ হাজার ৮’শ ডিম বিক্রি করে থাকেন। রোকেয়া বলেন, বর্তমানে পোল্ট্রি ও সবজি খামারে ১৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। এর মধ্যে চারজন নারী ও দুইজন প্রতিবন্ধি শ্রমিক রয়েছে। রোকেয়া পোল্ট্রি খামারের স্বত্ত্বাধিকারি নারী উদ্যোক্তা মোছাঃ রোকেয়া আক্তার আরও বলেন, মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে পরিবেশ বান্ধব একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট করেছি তা থেকে পরিবারের রান্নার কাজ চলছে। এতে কিছুটা হলেও রান্নার কাজে দেশের গাছ, কাঠ বেঁচে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমার আর্থিক অবস্থা পোল্ট্রি খামার দেখে এলাকার অনেক বেকার ছেলে পোল্ট্রি খামার করে তারাও আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বি হয়েছেন। তিনি বলেন দেশের অবহেলিত নারী সমাজকে এগিয়ে নিতে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, গবাদি পশু পালন, নকশী কাঁথা, টেইলারিং, হস্তশিল্প ও কম্পিউটার প্রশিক্ষন সেন্টার গড়ে তুলতে চাই।

রোকেয়া বলেন, চাকরি নামের সোনার হরিণের পেছনে না ছুটে পোল্ট্রি খামার করে স্বাবলম্বি হওয়া সম্ভব। এতে বেকারত্ব ঘুচবে এবং আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়া যায়। তিনি শিক্ষিত বেকার যুবকদের পোল্ট্রি খামার করার জন্য আহ্বান জানান। ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোস্তফা জামান বলেন, রোকেয়া আক্তার পোল্ট্রি খামার করে আজ তিনি সফল ও মডেল খামারি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

রোকেয়া পোল্ট্রি খামার করে কিছুটা হলেও দেশের মুরগি ও ডিমের চাহিদা পূরণ করছেন। সেই সাথে দেশের মানুষের পুষ্টির যোগানও দিচ্ছেন। রোকেয়ার দেখা দেখি ওই এলাকায় বেকারদের মধ্যে পোল্ট্রি খামারের প্রতিযোগিতা চলে এসেছে। রোকেয়া পোল্ট্রি খামারটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ভাবে সাজানো গোছানো। রোকেয়া এভাবে তার পোল্ট্রি খামারের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারলে আগামিতে স্বর্ণ শিখরে পৌছানো সময়ের ব্যাপার মাত্র।

 

ঘরে বসে ২/৩ ঘন্টার কাজ করে আজ সফল উদ্যোক্তা

 

সানজিদা খন্দকার। খুলনার মেয়ে, জন্ম চট্টগ্রামে। বড় হয়েছেন আরেক শহর রাজশাহীতে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। লেখাপড়া করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনে। সানজিদার আশপাশের অনেককেই সন্তান হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দিতে দেখে ‘টু আওয়ার জব’ আইডিয়াটা আসে তার মাথায়। ভাবলেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে চাকরি কীভাবে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। যারা ৮ ঘণ্টা অফিস করতে পারছেন না, তারা কি অল্প সময়ের জন্য কিছু করতে পারেন না! এই সমস্যার সমাধানে নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে শুরু করেন তার নিজের প্রতিষ্ঠান ‘দ্য টু আওয়ার জব’ নারীদের জন্য সানজিদাই বাংলাদেশে প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন। বর্তমানে ৪ হাজারের বেশি মেম্বার, ৬০০-এর বেশি কর্মকর্তা আছেন এই প্রতিষ্ঠানে, যারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সফল নারীদের এগিয়ে যাওয়ার তালিকায় সানজিদা খন্দকার একটি তারার নাম। ‘দ্য টু আওয়ার জব’ উদ্দেশ্য কী? ২০ থেকে ৪০ বছর বয়স হলো একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কর্মক্ষম সময়। এ সময়ে ছেলেরা খুব সুন্দরভাবে তার কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকে। কিন্তু একজন নারী ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিয়ে, বাচ্চা ও পরিবার নিয়ে। অথচ ছেলেমেয়ে উভয়কেই একই কষ্ট করতে হয়। একটি মেয়ের জন্য সন্তান ও পরিবারও জরুরি। তার অনেক দায়িত্ব, মেয়েটি যেন পরিবার মানিয়ে চলতে গিয়ে ক্যারিয়ার থেকে ছিটকে না পড়ে। সেজন্যই আমরা কাজ তার ঘরে এনে দিচ্ছি, যেন সে ঘরে বসে চালিয়ে যেতে পারে তার কাজ।

সানজিদা খন্দকার

 

এর পেছনের গল্প কী? আমি লক্ষ করে দেখতাম আমার বন্ধু এবং পরিবারের অনেক মেয়ে অফিসে ৮ ঘণ্টা সময় দিতে হয় বলে চাকরি করছে না। পরিবারের পাশাপাশি তারাও কিছু একটা করতে চায়। ৮ ঘণ্টা চাকরি করা অনেকের কাছেই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তখন ভাবতাম ২ বা ৩ ঘণ্টার জন্য কিছু যদি করতে পারতাম। তখন খুঁজে পাইনি এই সমস্যার সমাধান। চিন্তা করলাম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আমি আমার সমস্যার সমাধান করতে পারি। এ থেকেই আমার প্রতিষ্ঠানের পথ চলা শুরু। এটি চালু হওয়ার পর কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন? ক্যারিয়ার ব্রেকে যাওয়া নারীদের যোগ্যতা নিয়ে অনেকেই সন্ধিহান থাকেন। মনে করেন কাজের বাইরে থাকার জন্য হয়তো তার কাজের সেই যোগ্যতাটুকু আর নেই। আসলে এটা ভুল। ট্যালেন্ট এবং স্কিল বা অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড কখনোই একটা ব্রেকের কারণে মুছে যায় না; বরং তাদের মনে কাজ ফিরে পাওয়ার অসম্ভব ইচ্ছে কাজ করে। আর ইচ্ছেটাই তাদের কর্মদক্ষতাকে বাড়িয়ে দেয়।

টু আওয়ার্স জবের কাজ কী? প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দ্বারা প্রতিষ্ঠান ও নারীকর্মীদের সংযুক্ত করা। ফলে ওই নারী উক্ত প্রতিষ্ঠানের কাজ ঘরে বসেই করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় পর্যায়ে হোক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বা প্রাইভেট বা মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানেরই হোক, তাদের নিরাপত্তা এবং স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। ব্লগ লেখা থেকে শুরু করে এই ওয়েবসাইটে পেশাদার লেখা, ব্যবসায় সহায়তা, প্রোগ্রামিং, প্রযুক্তি, গ্রাফিকস, ডিজিটাল মার্কেটিং, অডিও সাপোর্ট, মার্কেট রিসার্চ, জীবনধারা, বিনোদন, গবেষণা, বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন ধরনের সেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তাদের প্রয়োজনীয় সেবা পেতে সাইটে ভিজিট করতে পারবেন। দক্ষ নারীরা লগ ইন করে সাইটে নিবন্ধন করতে পারবেন। ফেসবুকের মতো লগিং করে নাম ও সাধারণ কিছু তথ্য দিয়ে এই প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত হওয়া যাবে। ওয়েবসাইটিতে ব্যাংক ট্রান্সফার অথবা ভিসা মাস্টারকার্ড অথবা বিকাশের মাধ্যমে নিরাপদে পারিশ্রমিক পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে।

নারী হিসেবে পরিবারের কাছ থেকে কেমন সহযোগিতা পেয়েছেন? বাবা-মায়ের কাছ থেকে অনেক বেশি সাপোর্ট পেয়েছি। আমার নিজের পরিবারও অনেক সহযোগী ছিল এ বিষয়ে। তারা যতটা না আমার জন্য ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ও হাজারো নারীর জন্য। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের সফলতা? আমার অবস্থান থেকে আমি অনেক সন্তুষ্ট। অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল এই পথটা। একবার যখন দাঁড় করাতে পেরেছি, বাকিটা পথ অবশ্যই পারব বলে মনে করি। একটি মেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সে আরো তিনগুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে যায় মা হওয়ার পর। একজন নারী চিন্তা করে কীভাবে তার সন্তানের জন্য একটি ভালো পরিবেশ এবং সময় তৈরি করা যায়। আর এটা একজন উদ্যোক্তার শ্রেষ্ঠ গুণ। আমি মনে করি, উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের আরো বেশি এগিয়ে আসা উচিত। কেননা তারা নির্ভেজালভাবে সমাজের ও মানুষের মঙ্গল কামনা করে। নারী উদ্যোক্তা হতে গেলে একজন নারীর কী কী গুণ থাকা প্রয়োজন? সবচেয়ে বড় বিষয় আশাকে ধরে রাখা। অনেক চ্যালেঞ্জ থাকবে, ধৈর্য থাকতে হবে। সেই সঙ্গে অনেক ধীরস্থির থাকা জরুরি। হতাশ হওয়া যাবে না, কারণ একদিন সফলতা আসবেই। আমরা নারীরা নিজেরাই নিজেদের অনেক দুর্বল ভাবি। আর তাই আমি বলি, একজন নারী ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রমের অদ্ভূত সংমিশ্রণের মাধ্যমে প্রকৃত নারী হয়ে ওঠে। নারীকে বলব- নিজেদের সম্মান করুন, নিজেদের দুর্বল ভাববেন না। নিজের শক্তিকে অনুভব করুন। তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।