ঢাকা ০৮:৪৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

জিম্মি ২৩ জন নাবিকের বাড়িতে শোকের মাতম

চট্টগ্রাম প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০১:৩৬:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মার্চ ২০২৪ ১২১ বার পড়া হয়েছে

সংগৃহীত

নিউজ ফর জাস্টিস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

23 sailors :

ভারত মহাসাগরে জলদস্যুর কবলে পড়েছে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ। দস্যুরা জাহাজে থাকা ২৩ জন নাবিককে জিম্মি করে রেখেছে। এরপর এদিন বিকেলে জাহাজটি সোমালিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প গ্রুপ কবির স্টিলস’র অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের মালিকানাধীন এই জাহাজটি নৌপথে পণ্য পরিবহন করে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কবির স্টিলস’র মিডিয়া এডভাইজার মিজানুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, জাহাজটি এসআর শিপিংয়ের। এটি কয়লা নিয়ে আমিরাত যাচ্ছিলো। এরমধ্যে ভারত মহাসাগরে ডাকাতের কবলে পড়েছে। জিম্মিরা জাহাজের ২৩ জন নাবিককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করেছে। জানা যায়, জাহাজটি একটি কার্গো ভ্যাসেল। গত ৪ঠা মার্চ এটি কয়লা বোঝাই করে মোজাম্বিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পথে রওনা দেয়।

এরমধ্যে মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে সাব্বির নামে জাহাজের এক নাবিকের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে এসআর শিপিং কর্তৃপক্ষের কাছে খুদে বার্তা পাঠানো হয়।

সেই খুদে বার্তায় জাহাজ দস্যুদের কবলে পড়েছে বলে সাহায্য চাওয়া হয়। তবে কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেনি।

সেই খুদে বার্তায় নাবিক সাব্বির লেখেন, আমরা ডাকাতদের কবলে পড়েছি। প্রায় ৫০ জন ডাকাত। সবার হাতে অস্ত্র। আমাদেরকে বাঁচান।

এসআর শিপিংয়ের সিইও মোহাম্মদ মেহেরুল করিম বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে জাহাজ ডাকাতের কবলে পড়ার বিষয়টি জানানো হয়। আমাদের নাবিকরা আটকা পড়েছে। তারা কী অবস্থায় আছে তা এখনো বলতে পারছি না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাহাজে মোট ২৩ জন নাবিক রয়েছেন। তারা হলেন- জাহাজের মাস্টার মোহাম্মদ আবদুর রশিদ, চিফ অফিসার আতিক উল্লাহ খান, সেকেন্ড অফিসার মোজাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, থার্ড অফিসার এন মোহাম্মদ তারেকুল ইসলাম, ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এ এস এম সাইদুজ্জামান, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. তৌফিকুল ইসলাম, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. রোকন উদ্দিন, ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার তানভীর আহমেদ, ইঞ্জিনিয়ার ক্যাডেট আইয়ুব খান, ইলেকট্রিশিয়ান ইব্রাহীম খলিল উল্লাহ, ক্রু মো. আনোয়ারুল হক, মো. আসিফুর রহমান, মো. সাজ্জাদ হোসেন, জয় মাহমুদ, মো. নাজমুল হক, আইনুল হক, মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, মো. আলী হোসেন, মোশাররফ হোসেন শাকিল, মো. শরিফুল ইসলাম, মো. নুর উদ্দিন ও মো. সালেহ আহমদ।

মঙ্গলবার বিকেল থেকে তাদের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এর আগে নাবিকরা তাদের পরিবারের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে একাধিক ক্ষুদে বার্তা পাঠান। যেখানে তারা দস্যুর কবলে পড়ার খবর দিয়ে দোয়া কামনা করেন।

জাহাজের মালিক কেএসআরএম গ্রুপের কর্মকর্তারা বলেন, জাহাজে থাকা নাবিকরা ভালো আছেন। তাদের উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।

পরিবারের কাছে হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো ক্ষুদে বার্তায় জাহাজে থাকা একজন বলেন, আমাদের জন্য দোয়া করো। সোমালিয়ার জলদস্যুরা অ্যাটাক করেছে। অলরেডি আমরা অ্যারেস্টেড। আমাদের এক জায়গায় বন্দি করে রাখছে। মনে হচ্ছে নিয়ে যাবে। ওরা বোটেও উঠিয়ে ফেলছে অলরেডি।

জাহাজের ভিডিও বানিয়ে জনপ্রিয় নাবিক মারুফ এক ভিডিও বার্তায় বলেন, অন্তত ৫০ জন জলদস্যু এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের নাবিকদের জিম্মি করে। তার ভাষ্য সোমালিয়ানরা হয়ত মুক্তিপণের জন্য এটি করেছে। সাধারণত মুসলিম নাবিকদের সোমালিয়ান দস্যুরা বেশি ক্ষতি করে না।

এর আগে গোপনে হোয়াটসঅ্যাপে ইংরেজি বার্তা পাঠিয়েছেন জিম্মি ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন। তিনি লিখেন ‘প্লিজ, আমাদের বাঁচান। সোমালিয়ার জলদস্যুরা আমাদের জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর ওপর হামলা করেছে। তাদের হাতে রয়েছে ভারী অস্ত্রশস্ত্র। মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে এভাবেই উদ্ধারের আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠান জিম্মি ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন। নৌ বাণিজ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, জাহাজের ডেক ক্যাডেটের কাছ থেকে আক্রমণের কথা প্রথম জানতে পারি। এর পর জাহাজের মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি।

সাব্বিরের বাড়ি টাঙ্গাইলের নাগরপুরের সহবতপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গা ধলাপাড়া গ্রামে। চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমিতে পড়ালেখা শেষে ২০২২ সালের জুনে তিনি জাহাজে চাকরি নেন। একমাত্র ছেলে জিম্মি– জানতে পেরে গ্রামের বাড়িতে বাবা হারুন-অর রশিদ হাউমাউ করে কাঁদছেন। মা সালেহা বেগম বুক চাপড়ে আহাজারি করছেন। ভেঙে পড়েছেন একমাত্র বোন মিতু আক্তার।

মিতু আক্তার বলেন, ভাই সোমবার বিকেলে ফেসবুক পোস্টে বিষুব রেখা অতিক্রম করার কথা জানায়। মাথা ন্যাড়া করে ছবি দিয়েছে। এক মাস আগে সে বাড়ি এসে পরদিনই চলে যায়। মঙ্গলবার সকাল থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ। দুপুরে জলদস্যুর কবলে পড়ার খবর পেয়ে সবাই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। মা-বাবা খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে সারাক্ষণ কাঁদছেন। বলছেন, আমার ছেলেকে এনে দাও। ভাইয়ের কিছু হলে তাঁদের বাঁচানো যাবে না।

সাব্বিরের চাচাতো ভাই আহম্মেদ হোসেন রানা জানান, সাব্বির অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। বাবা কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। এখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী। বোনের বিয়ে হয়েছে। স্বামীকে নিয়ে সালেহা বেগম সহবতপুরে বাবার বাড়িতে বসবাস করেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম সাব্বিরের কিছু হলে পরিবারটির চলার কোনো উপায় থাকবে না।

মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে সাব্বিরের গ্রামের বাড়ি অনেকে ভিড় করেন। স্বজন সবাই উদ্বিগ্ন। তারা পরিবারটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। স্বজনের দাবি, সরকার যেন দ্রুত সাব্বিরকে মুক্ত করে আনে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন সবার আগে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে আমাদের সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক ইফতেখারুল আলমের কাছে দস্যুর আক্রমণের কথা জানান। তিনি জাহাজ নিয়ে দক্ষিণ চীনে আছেন। বার্তাটি তিনি সভাপতির কাছে ফরোয়ার্ড করেছেন। এরপর সন্ধ্যার দিকে চিফ ইঞ্জিনিয়ার এএসএম সাইফুজ্জামান আরেকটি মেসেজ দিয়েছেন কেএসআরএম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল করিমের কাছে। সেখানে তারা নিরাপদে আছেন বলে জানিয়েছেন। জাহাজটি জলদস্যুরা সোমালিয়ার উপকূলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

একই জাহাজে আছেন ক্রু জয় মাহমুদ। তার বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়ার পাঁকা ইউনিয়নের সালাইনগর গ্রামে; বাবার নাম জিয়াউর রহমান। দস্যুদের কবলে পড়ার খবরে সালাইনগর গ্রামের বাড়িতে সবাই আহাজারি করছেন। বিকেল ৪টার সময়ও জয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে পরিবারের।

জয়ের চাচাতো ভাই মারুফ হোসন বলেন, মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে মা ও বাবা কথা বলেন জয়ের সঙ্গে। এ সময় আমিও তার সঙ্গে কথা বলি। জয় আমাকে জলদস্যুদের কবলে পড়ার কথা জানালেও, মা-বাবাকে এটি বলেনি। সন্ধ্যা ৬টা ৩৯ মিনিটের সময় জয় আমার হোয়াটসঅ্যাপে জানায়– মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এর পর আর কথা বলতে পারব না। রাত ৯টার দিকে জয়ের দস্যুদের কবলে পড়ার কথা জানেন মা ও বাবা। এর পর ছেলের অমঙ্গলের আশঙ্কায় কেঁদে চলেছেন আরিফা বেগম।

আরিফা বেগম বলেন, ‘বিকেলেও জয় বলল, আফ্রিকার মধ্যে রয়েছে। ভালো আছে। এখন আমার বাছার কী হবে?’ জয়ের বাবা জিয়াউর রহমান সরকারের কাছে তার ছেলেসহ আটকে পড়া সবাইকে সুস্থ ও জীবিত উদ্ধারের দাবি জানান।

এসআর শিপিংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেহেরুল করিম বলেন, জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়ে। নাবিকরা নিরাপদে আছেন। সব ধরনের প্রোটোকল অনুসরণ করে নাবিকদের উদ্ধারে কাজ করছি।

জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯ দশমিক ৯৩ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩২ দশমিক ২৬ মিটার প্রস্থের জাহাজটি বাল্ক কেরিয়ার। এটি আফ্রিকার মোজাম্বিকের মাপুটো বন্দর থেকে ছেড়ে আসে। ১৯ মার্চ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ‘জাহান মণি’ নামে একটি বাংলাদেশি জাহাজ আরব সাগরে সোমালি জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল। দস্যুরা জাহাজের ২৫ জন নাবিকসহ মোট ২৬ জনকে জিম্মি করে। প্রায় ৩ মাস পর তারা দস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পান।

/শিল্পী/

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

জিম্মি ২৩ জন নাবিকের বাড়িতে শোকের মাতম

আপডেট সময় : ০১:৩৬:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মার্চ ২০২৪

23 sailors :

ভারত মহাসাগরে জলদস্যুর কবলে পড়েছে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ। দস্যুরা জাহাজে থাকা ২৩ জন নাবিককে জিম্মি করে রেখেছে। এরপর এদিন বিকেলে জাহাজটি সোমালিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প গ্রুপ কবির স্টিলস’র অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের মালিকানাধীন এই জাহাজটি নৌপথে পণ্য পরিবহন করে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কবির স্টিলস’র মিডিয়া এডভাইজার মিজানুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, জাহাজটি এসআর শিপিংয়ের। এটি কয়লা নিয়ে আমিরাত যাচ্ছিলো। এরমধ্যে ভারত মহাসাগরে ডাকাতের কবলে পড়েছে। জিম্মিরা জাহাজের ২৩ জন নাবিককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করেছে। জানা যায়, জাহাজটি একটি কার্গো ভ্যাসেল। গত ৪ঠা মার্চ এটি কয়লা বোঝাই করে মোজাম্বিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পথে রওনা দেয়।

এরমধ্যে মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে সাব্বির নামে জাহাজের এক নাবিকের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে এসআর শিপিং কর্তৃপক্ষের কাছে খুদে বার্তা পাঠানো হয়।

সেই খুদে বার্তায় জাহাজ দস্যুদের কবলে পড়েছে বলে সাহায্য চাওয়া হয়। তবে কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেনি।

সেই খুদে বার্তায় নাবিক সাব্বির লেখেন, আমরা ডাকাতদের কবলে পড়েছি। প্রায় ৫০ জন ডাকাত। সবার হাতে অস্ত্র। আমাদেরকে বাঁচান।

এসআর শিপিংয়ের সিইও মোহাম্মদ মেহেরুল করিম বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে জাহাজ ডাকাতের কবলে পড়ার বিষয়টি জানানো হয়। আমাদের নাবিকরা আটকা পড়েছে। তারা কী অবস্থায় আছে তা এখনো বলতে পারছি না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাহাজে মোট ২৩ জন নাবিক রয়েছেন। তারা হলেন- জাহাজের মাস্টার মোহাম্মদ আবদুর রশিদ, চিফ অফিসার আতিক উল্লাহ খান, সেকেন্ড অফিসার মোজাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, থার্ড অফিসার এন মোহাম্মদ তারেকুল ইসলাম, ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এ এস এম সাইদুজ্জামান, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. তৌফিকুল ইসলাম, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. রোকন উদ্দিন, ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার তানভীর আহমেদ, ইঞ্জিনিয়ার ক্যাডেট আইয়ুব খান, ইলেকট্রিশিয়ান ইব্রাহীম খলিল উল্লাহ, ক্রু মো. আনোয়ারুল হক, মো. আসিফুর রহমান, মো. সাজ্জাদ হোসেন, জয় মাহমুদ, মো. নাজমুল হক, আইনুল হক, মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, মো. আলী হোসেন, মোশাররফ হোসেন শাকিল, মো. শরিফুল ইসলাম, মো. নুর উদ্দিন ও মো. সালেহ আহমদ।

মঙ্গলবার বিকেল থেকে তাদের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এর আগে নাবিকরা তাদের পরিবারের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে একাধিক ক্ষুদে বার্তা পাঠান। যেখানে তারা দস্যুর কবলে পড়ার খবর দিয়ে দোয়া কামনা করেন।

জাহাজের মালিক কেএসআরএম গ্রুপের কর্মকর্তারা বলেন, জাহাজে থাকা নাবিকরা ভালো আছেন। তাদের উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।

পরিবারের কাছে হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো ক্ষুদে বার্তায় জাহাজে থাকা একজন বলেন, আমাদের জন্য দোয়া করো। সোমালিয়ার জলদস্যুরা অ্যাটাক করেছে। অলরেডি আমরা অ্যারেস্টেড। আমাদের এক জায়গায় বন্দি করে রাখছে। মনে হচ্ছে নিয়ে যাবে। ওরা বোটেও উঠিয়ে ফেলছে অলরেডি।

জাহাজের ভিডিও বানিয়ে জনপ্রিয় নাবিক মারুফ এক ভিডিও বার্তায় বলেন, অন্তত ৫০ জন জলদস্যু এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের নাবিকদের জিম্মি করে। তার ভাষ্য সোমালিয়ানরা হয়ত মুক্তিপণের জন্য এটি করেছে। সাধারণত মুসলিম নাবিকদের সোমালিয়ান দস্যুরা বেশি ক্ষতি করে না।

এর আগে গোপনে হোয়াটসঅ্যাপে ইংরেজি বার্তা পাঠিয়েছেন জিম্মি ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন। তিনি লিখেন ‘প্লিজ, আমাদের বাঁচান। সোমালিয়ার জলদস্যুরা আমাদের জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর ওপর হামলা করেছে। তাদের হাতে রয়েছে ভারী অস্ত্রশস্ত্র। মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে এভাবেই উদ্ধারের আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠান জিম্মি ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন। নৌ বাণিজ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, জাহাজের ডেক ক্যাডেটের কাছ থেকে আক্রমণের কথা প্রথম জানতে পারি। এর পর জাহাজের মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি।

সাব্বিরের বাড়ি টাঙ্গাইলের নাগরপুরের সহবতপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গা ধলাপাড়া গ্রামে। চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমিতে পড়ালেখা শেষে ২০২২ সালের জুনে তিনি জাহাজে চাকরি নেন। একমাত্র ছেলে জিম্মি– জানতে পেরে গ্রামের বাড়িতে বাবা হারুন-অর রশিদ হাউমাউ করে কাঁদছেন। মা সালেহা বেগম বুক চাপড়ে আহাজারি করছেন। ভেঙে পড়েছেন একমাত্র বোন মিতু আক্তার।

মিতু আক্তার বলেন, ভাই সোমবার বিকেলে ফেসবুক পোস্টে বিষুব রেখা অতিক্রম করার কথা জানায়। মাথা ন্যাড়া করে ছবি দিয়েছে। এক মাস আগে সে বাড়ি এসে পরদিনই চলে যায়। মঙ্গলবার সকাল থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ। দুপুরে জলদস্যুর কবলে পড়ার খবর পেয়ে সবাই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। মা-বাবা খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে সারাক্ষণ কাঁদছেন। বলছেন, আমার ছেলেকে এনে দাও। ভাইয়ের কিছু হলে তাঁদের বাঁচানো যাবে না।

সাব্বিরের চাচাতো ভাই আহম্মেদ হোসেন রানা জানান, সাব্বির অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। বাবা কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। এখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী। বোনের বিয়ে হয়েছে। স্বামীকে নিয়ে সালেহা বেগম সহবতপুরে বাবার বাড়িতে বসবাস করেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম সাব্বিরের কিছু হলে পরিবারটির চলার কোনো উপায় থাকবে না।

মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে সাব্বিরের গ্রামের বাড়ি অনেকে ভিড় করেন। স্বজন সবাই উদ্বিগ্ন। তারা পরিবারটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। স্বজনের দাবি, সরকার যেন দ্রুত সাব্বিরকে মুক্ত করে আনে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন সবার আগে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে আমাদের সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক ইফতেখারুল আলমের কাছে দস্যুর আক্রমণের কথা জানান। তিনি জাহাজ নিয়ে দক্ষিণ চীনে আছেন। বার্তাটি তিনি সভাপতির কাছে ফরোয়ার্ড করেছেন। এরপর সন্ধ্যার দিকে চিফ ইঞ্জিনিয়ার এএসএম সাইফুজ্জামান আরেকটি মেসেজ দিয়েছেন কেএসআরএম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল করিমের কাছে। সেখানে তারা নিরাপদে আছেন বলে জানিয়েছেন। জাহাজটি জলদস্যুরা সোমালিয়ার উপকূলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

একই জাহাজে আছেন ক্রু জয় মাহমুদ। তার বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়ার পাঁকা ইউনিয়নের সালাইনগর গ্রামে; বাবার নাম জিয়াউর রহমান। দস্যুদের কবলে পড়ার খবরে সালাইনগর গ্রামের বাড়িতে সবাই আহাজারি করছেন। বিকেল ৪টার সময়ও জয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে পরিবারের।

জয়ের চাচাতো ভাই মারুফ হোসন বলেন, মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে মা ও বাবা কথা বলেন জয়ের সঙ্গে। এ সময় আমিও তার সঙ্গে কথা বলি। জয় আমাকে জলদস্যুদের কবলে পড়ার কথা জানালেও, মা-বাবাকে এটি বলেনি। সন্ধ্যা ৬টা ৩৯ মিনিটের সময় জয় আমার হোয়াটসঅ্যাপে জানায়– মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এর পর আর কথা বলতে পারব না। রাত ৯টার দিকে জয়ের দস্যুদের কবলে পড়ার কথা জানেন মা ও বাবা। এর পর ছেলের অমঙ্গলের আশঙ্কায় কেঁদে চলেছেন আরিফা বেগম।

আরিফা বেগম বলেন, ‘বিকেলেও জয় বলল, আফ্রিকার মধ্যে রয়েছে। ভালো আছে। এখন আমার বাছার কী হবে?’ জয়ের বাবা জিয়াউর রহমান সরকারের কাছে তার ছেলেসহ আটকে পড়া সবাইকে সুস্থ ও জীবিত উদ্ধারের দাবি জানান।

এসআর শিপিংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেহেরুল করিম বলেন, জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়ে। নাবিকরা নিরাপদে আছেন। সব ধরনের প্রোটোকল অনুসরণ করে নাবিকদের উদ্ধারে কাজ করছি।

জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯ দশমিক ৯৩ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩২ দশমিক ২৬ মিটার প্রস্থের জাহাজটি বাল্ক কেরিয়ার। এটি আফ্রিকার মোজাম্বিকের মাপুটো বন্দর থেকে ছেড়ে আসে। ১৯ মার্চ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ‘জাহান মণি’ নামে একটি বাংলাদেশি জাহাজ আরব সাগরে সোমালি জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল। দস্যুরা জাহাজের ২৫ জন নাবিকসহ মোট ২৬ জনকে জিম্মি করে। প্রায় ৩ মাস পর তারা দস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পান।

/শিল্পী/