ঢাকা ১১:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

আমি বড় ফুটবলার হতে চাই : ইয়ারজান

ক্রীড়া ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৩:০৯:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মার্চ ২০২৪ ৬৮ বার পড়া হয়েছে

ফাইল ফটো

নিউজ ফর জাস্টিস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

Yarjan :

সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের গোলরক্ষক ইয়ারজান বেগম বলেন, অনেক বাধা পেরিয়ে এই জায়গায় এসেছি। স্বপ্নটা এখন আরও বিস্তৃত। আমি মাত্র শুরু করলাম। যেতে হবে বহুদূর। আমি জাতীয় দলে খেলতে চাই। রুপনা আপুর (রুপনা চাকমা মেয়েদের জাতীয় দলের এক নম্বর গোলকিপার) মতো খেলতে চাই। আমি বড় ফুটবলার হতে চাই।

নেপালে মেয়েদের সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্টের ফাইনালে ভারতের তিনটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে ‘বীর’ যে সে-ই সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের গোলরক্ষক ইয়ারজান বেগম। গত রোববার (১০ মার্চ) নেপালের কাঠমুন্ডুতে ফাইনালে ভারতকে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। আর এই অর্জনে মূল ভূমিকা পালন করে গোলরক্ষক ইয়ারজান। তার এই বীরত্বেই গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে বইছে উৎসব। টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের ট্রফিটাও নিজের করে নিয়েছেন তিনি। তার এই সাফল্যে গ্রামের বাড়িতে মিষ্টি বিতরণ করেছে এলাকাবাসী।

গ্রামের এক হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মেয়ে ইয়ারজান বেগম। সে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের খোপড়াবান্দি গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে।

জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রামে ইয়ারজানদের বাড়ি। সড়কের পাশেই ছোট ছোট দুইটি ঘর তাদের। এরমধ্যে একটি ঘর একেবারেই জরাজীর্ণ। একপাশে ছাউনির টিনগুলো খুলে গেছে। সেই ঘরের শোকেসে সাজানো আছে ইয়ারজানের সাফল্যের ক্রেস্ট এবং ট্রফি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইয়ারজানের বাবা আব্দুর রাজ্জাক শারীরিকভাবে অসুস্থ। কোনো কাজ করতে পারেন না তিনি। ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মা রেনু বেগম। মায়ের উপার্জনেই চলে তাদের সংসার। সম্পদ বলতে তাদের কেবল ভিটেমাটি।

মা রেনু বেগম বলেন, মানুষের কৃষিজমিতে কাজ করে মেয়েকে বড় করেছি। খুব কষ্ট করে আমার মেয়ে এই পর্যন্ত এসেছে। অভাবের সংসারে মেয়েকে তিনবেলা ঠিকমতো খাওয়াতে পারিনি। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে সাফল্য এনে দিয়েছে। আমাদের গর্বিত করেছে। মানুষ অনেক কথা বলেছে। একসময় তাকে আটকানোর চেষ্টা করেছি তবুও নিজের মত করে এগিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রথম ২০ টাকা হাজিরায় শুরু করে এখন দৈনিক ২৫০ টাকা মজুরি পাই। এ দিয়েই অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা খরচ এবং সংসার চালাই। অনেক সময়ে মেয়েকে অনুশীলনে যাওয়ার যাতায়াত ভাড়া দিতে পারতাম না। কিছু কিনে খাবে এজন্য অতিরিক্ত টাকা কখনই দিতে পারিনি। আজকে সব কষ্ট আমার দুর হয়েছে, গর্বে বুক ভরে গেছে আমার।

ইয়ারজানের বাবা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ছোট থেকেই ফুটবলের প্রতি আগ্রহ মেয়ের। তবে আমরা কখনও উৎসাহ দেইনি, মানুষও ভালো বলতো না। তাছাড়া অনুশীলনে পাঠানোর মত ব্যবস্থাও ছিল না। কিন্তু মেয়ে এসবে তোয়াক্কা করতো না। তাই সংসারে টানাপোড়ন উপেক্ষা করেই তাকে সাপোর্ট দিয়েছি। সবচেয়ে বেশি অবদান তার মায়ের। টুকু ফুটবল একাডেমিও অনেক সহযোগিতা করেছে তাকে। এখন আমার মেয়ে সেরা গোলরক্ষক। ইয়ারজানের এমন গর্বে গর্বিত স্থানীয়রা।

নানাজনের নানা বাজে কথায় ইয়ারজানের ফুটবল খেলাই বন্ধ হওয়ার অবস্থা হয়েছিল। এই সময় ত্রাতা হয়ে আসেন স্থানীয় ফুটবল কোচ আবু তালেব। আবু তালেবের একটা একাডেমি আছে। সেখানে বাচ্চাদের ফুটবল শেখান তিনি। মেয়েদেরও শেখান।

ইয়ারজান জানান কীভাবে তাকে ফুটবলে এনেছেন আবু তালেব, আবু তালেব আমার কোচ, তিনিই বাবাকে বলে তাঁর একাডেমিতে নিয়ে যান। বাবাও মানা করেননি। তিনি তো চাইতেনই আমি ফুটবলার হই। এই আবু তালেবকে আমি স্যার বলি না, বলি ভাইয়া। তিনি আমার ভাই।’

আবু তালেবের কারণেই যে এই পর্যায়ে আসা ইয়ারজান, সেটি স্মরণ করল শ্রদ্ধার সঙ্গেই, তিনি না থাকলে আমি এখানে আসতে পারতাম না। তিনি বলতেন, অনেকেই বাজে কথা বলবে, আমি যেন কান না দিই। ভাইয়া বলতেন, আমি তোকে ঢাকায় খেলাব। তুই নিশ্চিন্তে খেলে যা।

বাড়ি থেকে আবু তালেবের একাডেমিটা ছিল একটু দূরেই। অনেক সময় নাকি আসা-যাওয়ার ভাড়াও থাকত না ইয়ারজানের কাছে, আমার কাছে সব সময় টাকা থাকত না। বাবাও দিতে পারতেন না। আবু তালেব ভাইয়াই নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন। আমাকে বুট থেকে শুরু করে অন্য সরঞ্জামাদি কিনে দিয়েছেন।

টুকু ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক আবু তারেক টুকু বলেন, আমার একাডেমির খেলোয়াড়ের এমন সাফল্য আমাদের নাম উজ্জ্বল করছে। প্রথম থেকেই দেখেছি তার খেলার প্রতি অনেক আগ্রহ ছিল। দোয়া করি আরও অনেকদূর এগিয়ে যাবে ইয়ারজান।

তিনি আরও বলেন, ইয়ারজানের মত খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করতে আমরা কাজ করছি।

/শিল্পী/

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আমি বড় ফুটবলার হতে চাই : ইয়ারজান

আপডেট সময় : ০৩:০৯:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মার্চ ২০২৪

Yarjan :

সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের গোলরক্ষক ইয়ারজান বেগম বলেন, অনেক বাধা পেরিয়ে এই জায়গায় এসেছি। স্বপ্নটা এখন আরও বিস্তৃত। আমি মাত্র শুরু করলাম। যেতে হবে বহুদূর। আমি জাতীয় দলে খেলতে চাই। রুপনা আপুর (রুপনা চাকমা মেয়েদের জাতীয় দলের এক নম্বর গোলকিপার) মতো খেলতে চাই। আমি বড় ফুটবলার হতে চাই।

নেপালে মেয়েদের সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্টের ফাইনালে ভারতের তিনটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে ‘বীর’ যে সে-ই সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের গোলরক্ষক ইয়ারজান বেগম। গত রোববার (১০ মার্চ) নেপালের কাঠমুন্ডুতে ফাইনালে ভারতকে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। আর এই অর্জনে মূল ভূমিকা পালন করে গোলরক্ষক ইয়ারজান। তার এই বীরত্বেই গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে বইছে উৎসব। টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের ট্রফিটাও নিজের করে নিয়েছেন তিনি। তার এই সাফল্যে গ্রামের বাড়িতে মিষ্টি বিতরণ করেছে এলাকাবাসী।

গ্রামের এক হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মেয়ে ইয়ারজান বেগম। সে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের খোপড়াবান্দি গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে।

জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রামে ইয়ারজানদের বাড়ি। সড়কের পাশেই ছোট ছোট দুইটি ঘর তাদের। এরমধ্যে একটি ঘর একেবারেই জরাজীর্ণ। একপাশে ছাউনির টিনগুলো খুলে গেছে। সেই ঘরের শোকেসে সাজানো আছে ইয়ারজানের সাফল্যের ক্রেস্ট এবং ট্রফি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইয়ারজানের বাবা আব্দুর রাজ্জাক শারীরিকভাবে অসুস্থ। কোনো কাজ করতে পারেন না তিনি। ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মা রেনু বেগম। মায়ের উপার্জনেই চলে তাদের সংসার। সম্পদ বলতে তাদের কেবল ভিটেমাটি।

মা রেনু বেগম বলেন, মানুষের কৃষিজমিতে কাজ করে মেয়েকে বড় করেছি। খুব কষ্ট করে আমার মেয়ে এই পর্যন্ত এসেছে। অভাবের সংসারে মেয়েকে তিনবেলা ঠিকমতো খাওয়াতে পারিনি। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে সাফল্য এনে দিয়েছে। আমাদের গর্বিত করেছে। মানুষ অনেক কথা বলেছে। একসময় তাকে আটকানোর চেষ্টা করেছি তবুও নিজের মত করে এগিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রথম ২০ টাকা হাজিরায় শুরু করে এখন দৈনিক ২৫০ টাকা মজুরি পাই। এ দিয়েই অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা খরচ এবং সংসার চালাই। অনেক সময়ে মেয়েকে অনুশীলনে যাওয়ার যাতায়াত ভাড়া দিতে পারতাম না। কিছু কিনে খাবে এজন্য অতিরিক্ত টাকা কখনই দিতে পারিনি। আজকে সব কষ্ট আমার দুর হয়েছে, গর্বে বুক ভরে গেছে আমার।

ইয়ারজানের বাবা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ছোট থেকেই ফুটবলের প্রতি আগ্রহ মেয়ের। তবে আমরা কখনও উৎসাহ দেইনি, মানুষও ভালো বলতো না। তাছাড়া অনুশীলনে পাঠানোর মত ব্যবস্থাও ছিল না। কিন্তু মেয়ে এসবে তোয়াক্কা করতো না। তাই সংসারে টানাপোড়ন উপেক্ষা করেই তাকে সাপোর্ট দিয়েছি। সবচেয়ে বেশি অবদান তার মায়ের। টুকু ফুটবল একাডেমিও অনেক সহযোগিতা করেছে তাকে। এখন আমার মেয়ে সেরা গোলরক্ষক। ইয়ারজানের এমন গর্বে গর্বিত স্থানীয়রা।

নানাজনের নানা বাজে কথায় ইয়ারজানের ফুটবল খেলাই বন্ধ হওয়ার অবস্থা হয়েছিল। এই সময় ত্রাতা হয়ে আসেন স্থানীয় ফুটবল কোচ আবু তালেব। আবু তালেবের একটা একাডেমি আছে। সেখানে বাচ্চাদের ফুটবল শেখান তিনি। মেয়েদেরও শেখান।

ইয়ারজান জানান কীভাবে তাকে ফুটবলে এনেছেন আবু তালেব, আবু তালেব আমার কোচ, তিনিই বাবাকে বলে তাঁর একাডেমিতে নিয়ে যান। বাবাও মানা করেননি। তিনি তো চাইতেনই আমি ফুটবলার হই। এই আবু তালেবকে আমি স্যার বলি না, বলি ভাইয়া। তিনি আমার ভাই।’

আবু তালেবের কারণেই যে এই পর্যায়ে আসা ইয়ারজান, সেটি স্মরণ করল শ্রদ্ধার সঙ্গেই, তিনি না থাকলে আমি এখানে আসতে পারতাম না। তিনি বলতেন, অনেকেই বাজে কথা বলবে, আমি যেন কান না দিই। ভাইয়া বলতেন, আমি তোকে ঢাকায় খেলাব। তুই নিশ্চিন্তে খেলে যা।

বাড়ি থেকে আবু তালেবের একাডেমিটা ছিল একটু দূরেই। অনেক সময় নাকি আসা-যাওয়ার ভাড়াও থাকত না ইয়ারজানের কাছে, আমার কাছে সব সময় টাকা থাকত না। বাবাও দিতে পারতেন না। আবু তালেব ভাইয়াই নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন। আমাকে বুট থেকে শুরু করে অন্য সরঞ্জামাদি কিনে দিয়েছেন।

টুকু ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক আবু তারেক টুকু বলেন, আমার একাডেমির খেলোয়াড়ের এমন সাফল্য আমাদের নাম উজ্জ্বল করছে। প্রথম থেকেই দেখেছি তার খেলার প্রতি অনেক আগ্রহ ছিল। দোয়া করি আরও অনেকদূর এগিয়ে যাবে ইয়ারজান।

তিনি আরও বলেন, ইয়ারজানের মত খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করতে আমরা কাজ করছি।

/শিল্পী/